স্টাফ রিপোর্টার, ঢাকা:
দেশের সর্বোচ্চ বিচারিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট-এর হাইকোর্ট বিভাগ—যেখানে ন্যায়বিচারের শেষ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা—সেই স্থানেই এখন বিচারপ্রার্থীদের একাংশের কাছে দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার গুরুতর অভিযোগ উঠছে।
আইনের শাসনের মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সমতা। কিন্তু বিচারপ্রার্থীদের দাবি, বাস্তবে এই নীতিগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার পেতে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে।
অভিযোগের মূল চিত্র
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী—
কজলিস্টে নির্ধারিত মামলার পরিবর্তে “ম্যানশন” নামের প্রক্রিয়ায় হঠাৎ করে মামলা শুনানিতে আনা হচ্ছে, যা নিয়মতান্ত্রিক ধারার বাইরে। এর ফলে প্রভাবশালী পক্ষ বা আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা অগ্রাধিকার পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিদিনই “জরুরি” ম্যানশন দেখিয়ে তালিকার বাইরে শুনানি
সিনিয়র আইনজীবীদের বিভিন্ন অজুহাতে মামলা অগ্রাধিকার পরিবর্তন
বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের কার্যক্রম যদি নির্ধারিত তালিকা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে, তাহলে বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়।
প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অনিয়ম
অভিযোগ অনুযায়ী আদালতের দাপ্তরিক কার্যক্রমেও নানা অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে—
তালিকাভুক্ত মামলার শুনানি অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে
আদেশ (Order) সংগ্রহে অস্বাভাবিক বিলম্ব
ফাইল “খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না” এমন অজুহাত
“নট প্লেস” দেখিয়ে মামলা ঝুলিয়ে রাখা
কোর্ট সমাপ্তির পর গুরুত্বপূর্ণ ফাইল নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ
রোলের কপি জমা দেওয়ার পরও কার্যকর অগ্রগতি নেই
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সমস্যা মূলত প্রশাসনিক জবাবদিহিতার অভাব এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার অনুপস্থিতির কারণে সৃষ্টি হচ্ছে।
বাস্তব ঘটনা: প্রতিকারহীন ভোগান্তি
গত ০৬-০১-২০২৬ তারিখে দাখিলকৃত একটি রিভিশন মামলা (নং: ২৬১৪/২৪), এনেক্স ভবনের কোর্ট নং-৪-এ নিষ্পত্তি (Disposed) হওয়ার পরও অভিযোগ রয়েছে যে, দুই মাস অতিবাহিত হলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষ সার্টিফাইড কপি সংগ্রহ করতে পারেনি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দাবি করেন,
প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, আইনমন্ত্রী ও সংসদীয় কমিটিসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ পাঠানো হলেও—
অভিযোগের কাগজপত্রের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি
এমনকি প্রধান বিচারপতির দপ্তরেও অভিযোগের কপি অনুপস্থিত বলে জানানো হয়েছে
এই পরিস্থিতি বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা ও আস্থাহীনতা তৈরি করছে।
ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন
যে আদালত অন্যায়ের বিচার করে,
যে আদালত অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করে—
সেই প্রতিষ্ঠান নিয়েই যদি প্রশ্ন উঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের সামনে বিকল্প কী?
একটি প্রচলিত উপমা এখানে প্রাসঙ্গিক—
একটি ছেলে গাছ থেকে পড়ে থাকা আম চুরি করলে গাছের মালিক বলে, “তোর বাবার কাছে বিচার দিব।”
ছেলে উত্তর দেয়, “লাভ নাই, বাবা তো ঐ গাছেই আছে!”
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে এই উপমার মিল খুঁজে পাচ্ছেন অনেকেই।
বিশ্লেষণ
আইন বিশ্লেষকদের মতে—
আদালতের কার্যক্রমে ডিজিটাল স্বচ্ছতা না থাকলে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়
প্রশাসনিক স্তরে নিয়ন্ত্রণহীনতা থাকলে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়
জবাবদিহিতা না থাকলে অভিযোগ নিষ্পত্তি হয় না
এ কারণে বিচার ব্যবস্থার সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
সুপারিশ: সংস্কারের ১০ দফা প্রস্তাব
বিচার বিভাগকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে
“নতুন বাংলা সাধারণ জনতার জোট”-এর পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত সুপারিশ দেওয়া হয়েছে—
১। বিতর্কিত সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিরপেক্ষ তদন্ত
২। রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীভিত্তিক নিয়োগ বাতিল
৩। বেঞ্চ অফিসারসহ কর্মচারীদের মেধাভিত্তিক পুনর্নিয়োগ
৪। প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগসমূহ পুনর্মূল্যায়ন
৫। মামলার শুনানি স্বয়ংক্রিয় সিরিয়াল অনুযায়ী পরিচালনা
৬। আদালতের আদেশে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে নীতিমালা
৭। মেনশন শুনানির জন্য পৃথক সময়/আদালত নির্ধারণ
৮। কর্মচারী ও ক্লার্কদের অনিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ
৯। কজলিস্ট ও তথ্য সরাসরি মোবাইলে পাঠানোর ডিজিটাল ব্যবস্থা
১০। আইনজীবীদের সম্মানীর নির্ধারিত কাঠামো ও বাধ্যতামূলক রশিদ
চূড়ান্ত বার্তা
ন্যায়বিচার একটি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি।
এই ভিত্তি দুর্বল হলে পুরো রাষ্ট্র কাঠামোই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
ন্যায় চাই, সত্য চাই
বিচারের নামে অবিচার আর নয়
মোঃ আকবর হোসেন ফাইটন
চেয়ারম্যান
নতুন বাংলা সাধারণ জনতার জোট
মোবাইল: ০১৭০৮৫৬৫৯০২