সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ০২:৫২ অপরাহ্ন
Headline :
রাঙ্গামাটির লংগদুতে মাদ্রাসা সভাপতিট সংবাদ সম্মেলনের প্রতিবাদে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন মোঃ এরশাদ আলী,  লংগদু প্রতিনিধি নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ: ট্রাফিক সার্জেন্ট ক্লোজড আরমান হোসেন রাজু রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার। ০১৭১৭৭৭৬৯৭২ বিকেলে উদ্বোধন, রাতেই ফাটল লালমনিরহাটে ১৩ কোটি টাকার এলজিইডি প্রকল্প ঘিরে প্রশ্নের ঝড় আরমান হোসেন রাজু রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার। ০১৭১৭৭৭৬৯৭২ হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে স্বামীর দা’য়ের কুপে স্ত্রী খুন! ঘাতক স্বামী পুলিশের হাতে আটক বুলবুল আহমেদ, নবীগঞ্জ হবিগঞ্জ প্রতিনিধি নবীগঞ্জের প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা সরকারী তালিকা থেকে বাদ পড়লেন! ইউএনও বরাবরে লিখিত অভিযোগ৷৷ নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ লাকসাম পৌর মেয়র পদে আলহাজ্ব মজির আহমেদের মনোনয়ন দাবি পৌরবাসীর* *লাকসাম প্রতিনিধি | দৈনিক বাংলার সংবাদ* নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক বাংলার সংবাদ* *গাজীপুর | [তারিখ বসান: ২০ এপ্রিল ২০২৬, রবিবার] | [সময় বসান]* শিশু কল্যাণে সাংবাদিকদের ভূমিকা বিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত মোঃ আকাশ,বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি: বান্দরবান শহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অভিভাবক সমাবেশ শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক মোঃ সোহেল আজাদকে সংবর্ধনা মোঃ আকাশ,বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি: বান্দরবান মনোহরগঞ্জে বিদ্যুৎ সংযোগের নামে কোটি টাকা হাতানোর অভিযোগ, মেম্বারের বিরুদ্ধে তদন্ত দাবি ভুক্তভোগীদের* *মনোহরগঞ্জ প্রতিনিধি | দৈনিক বাংলার সংবাদ*

পুলিশি গ্রেপ্তার আতঙ্কে স্তব্ধ ফলিমারী পুরুষশূন্য গ্রাম, বাজারে নেই ক্রেতা-বিক্রেতা: থমকে গেছে কৃষিকাজ আরমান হোসেন রাজু রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার। ০১৭১৭৭৭৬৯৭২

Update : শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

পুলিশি গ্রেপ্তার আতঙ্কে স্তব্ধ ফলিমারী
পুরুষশূন্য গ্রাম, বাজারে নেই ক্রেতা-বিক্রেতা: থমকে গেছে কৃষিকাজ

আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রাম যেন কয়েক দিনের ব্যবধানে বদলে গেছে এক অচেনা জনপদে। যে গ্রামে প্রতিদিন কৃষিকাজ, বাজারের কোলাহল, মন্দিরের কীর্তন আর মানুষের স্বাভাবিক চলাচলে প্রাণচাঞ্চল্য থাকত, সেখানে এখন বিরাজ করছে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর নীরবতা।

শিশু নন্দিনী রানী (৭) হত্যা মামলাকে কেন্দ্র পুলিশের সাথে সংঘর্ষ, গাড়ি ভাংচুরের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলায় তিন হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা এবং পরবর্তীতে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপক গ্রেপ্তার আতঙ্ক। সেই আতঙ্কে অধিকাংশ পুরুষ বাড়িঘর ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় কার্যত পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে পুরো গ্রাম।

শনিবার দুপুরে সরেজমিনে ফলিমারী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের প্রধান বাজার ফলিমারী বাজার প্রায় জনশূন্য। সাধারণত সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই বাজারে স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর থাকে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, কৃষি উপকরণ, পান-সুপারি, মুদি ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে ২৪টি দোকান রয়েছে। কিন্তু বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে বাজারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২৪টির মধ্যে ২২টি দোকান বন্ধ। খোলা থাকা দুটি দোকানও কয়েক ঘণ্টার বেশি চালু রাখা যাচ্ছে না।

বাজারের সার ব্যবসায়ী লিটন চন্দ্র রায় বলেন, “প্রতিবছরের মতো এবারও আমার দোকানে হালখাতার আয়োজন ছিল। প্রায় পাঁচ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে বিভিন্ন কৃষকের কাছে। আশা করেছিলাম অন্তত চার লাখ টাকা আদায় হবে। এজন্য ক্রেতাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থাও করেছিলাম। কিন্তু দিনভর অপেক্ষা করেও একজন ক্রেতাও দোকানে আসেননি। পরে বাধ্য হয়ে খাবারগুলো প্যাকেট করে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি।”
তিনি বলেন, “পুলিশি গ্রেপ্তার এড়াতে গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ বাড়িঘর ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে বাজার, কৃষিকাজ, সামাজিক অনুষ্ঠান সবকিছুই অচল হয়ে পড়েছে।”

পানের দোকানদার সন্তোষ চন্দ্র রায় বলেন, “দোকান খুলে বসে থাকছি, কিন্তু কোনো ক্রেতা নেই। বাজারে এক ধরনের ভূতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে তা বলতে পারছি না। ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।”

গত মঙ্গলবার নন্দিনী রানী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উত্তেজিত জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ এবং সরকারি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরদিন আদিতমারী থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় তিন হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হলে গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত পুলিশ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করলে সেই আতঙ্ক আরও তীব্র হয়।
গ্রামের প্রায় ৪০০ পরিবারের অধিকাংশই কৃষিনির্ভর। বর্তমানে বোরো ধান কাটার মৌসুম চলায় কৃষকদের ব্যস্ত থাকার কথা থাকলেও পুরুষদের অনুপস্থিতিতে কৃষিকাজও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নিরোবালা রানী বলেন, “আমাদের চার বিঘা জমির ধান পেকে গেছে। দ্রুত কাটতে না পারলে ক্ষতির আশঙ্কা আছে। কিন্তু আমার স্বামী ও ছেলে বাড়িতে নেই। গ্রামে শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ধান ঘরে তুলতে পারছি না।”
তার অভিযোগ, “পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর কিংবা আসামির বাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় গ্রামের সাধারণ মানুষ জড়িত নন। বহিরাগতরাই এসব করেছে। কিন্তু এখন গ্রামের সব পুরুষই সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।”

একই ধরনের দুর্ভোগের কথা জানান মল্লিকা রানী। তিনি বলেন, “তিন বিঘা জমির ধান কেটে বাড়ির উঠানে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। কিন্তু মাড়াই করার লোক নেই। স্বামী বাড়িছাড়া, শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ফসল নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি।”

ফলিমারী গ্রামের চারটি মন্দিরেও দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় পূজা ও কীর্তনের আয়োজন থাকলেও গত বুধবারের পর থেকে সেসব কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
স্বপ্না রানী বলেন, “গ্রামের চারটি মন্দিরের একটিতেও নিয়মিত পূজা-অর্চনা হচ্ছে না। কীর্তন বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রামের বেশিরভাগ পুরুষ বাড়িতে নেই। হাতে গোনা কয়েকজন আছেন, তারাই রাতে গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন। এই অবস্থা দীর্ঘ হলে সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে বড় ধরনের ক্ষতি হবে।”

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করে ভ্যানচালক উকিল চন্দ্র বর্মণ বলেন, “নন্দিনীর মরদেহ উদ্ধারের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক মানুষ গ্রামে এসেছিল। তাদের অনেককেই আমরা চিনতাম না। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বহিরাগতদেরই বেশি সক্রিয় দেখা গেছে। এখন পুরো গ্রামের মানুষ তার খেসারত দিচ্ছে।”
তিনি বলেন, “পুরুষশূন্য হয়ে যাওয়ায় গ্রামটি অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় এবং মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।”

এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ-সার্কেল) এ কে এম ফজলুল হক বলেন, “ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করা হচ্ছে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হবেন না।”
তিনি আরও বলেন, “আমি নিজে ফলিমারী গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাদের আশ্বস্ত করেছি। গ্রামটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত পুলিশ টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিরপরাধ গ্রামবাসীদের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।”

নন্দিনী হত্যা মামলার তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও ফলিমারীর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং গ্রামে ফিরে আসবে স্বস্তি, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বর্তমানে সেই অপেক্ষাতেই দিন গুনছেন গ্রামের নারী, শিশু ও প্রবীণরা।


More News Of This Category