মোঃ মেহেদী হাসান স্টাফ রিপোর্টার,
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা–ফুলছড়ি) আসনে নির্বাচনী তৎপরতা বেড়েছে। যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদবেষ্টিত এই আসনে এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন চরাঞ্চলের ভোটাররা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চরাঞ্চলের ভোট একমুখী হলে তা জয়-পরাজয়ের সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচন নিয়ে মাঠে সরব থাকলেও এ আসনে গণভোট বা সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে দৃশ্যমান কোনো প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সাধারণ ভোটারদের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে প্রার্থীদের ব্যক্তি পরিচয়, উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি ও অতীত কর্মকাণ্ড।
সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনের ১৭টি ইউনিয়নের বড় অংশ নদীবর্তী ও চরাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। যমুনার ভাঙনে বারবার বাস্তুচ্যুত এসব এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। ফলে এবারের নির্বাচনে চরাঞ্চল প্রার্থীদের প্রচারণার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
ফুলছড়ি উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের অধিকাংশ এবং সাঘাটা উপজেলার সাঘাটা ও হলদিয়া ইউনিয়নের উল্লেখযোগ্য অংশ চরাঞ্চলভুক্ত। মূল ভূখণ্ডের ভোট যেখানে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত, সেখানে চরাঞ্চলের ভোট সাধারণত একটি ধারায় প্রবাহিত হয় বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
ব্রহ্মপুত্র নদের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে কৃষিকাজ সম্প্রসারিত হয়েছে। অর্ধশতাধিক চর থেকে বছরে বিপুল পরিমাণ ফসল উৎপাদন হচ্ছে, যা জেলার অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল, বিদ্যুৎ সুবিধার অভাব এবং নদীভাঙনের স্থায়ী সমাধান না থাকায় এসব এলাকার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
এ কারণে প্রার্থীরা এখন চরাঞ্চলে বাড়তি সময় দিচ্ছেন। নৌপথে দুর্গম চরগুলোতে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করছেন তারা। প্রচারণায় নদীভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, জিও ব্যাগ ডাম্পিং, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, বিদ্যুৎ ও সৌরবিদ্যুৎ সুবিধা সম্প্রসারণ, চরের অভ্যন্তরে রাস্তা নির্মাণ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনবল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে।
চরাঞ্চলের ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা আগের তুলনায় বেড়েছে। সাঘাটার দিঘলকান্দি চরের এক প্রবীণ ভোটার বলেন, বন্যা ও ভাঙনের সময় জনপ্রতিনিধিদের পাশে পাওয়া যায় না। তাই এবার বুঝে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। তরুণ ভোটাররাও কর্মসংস্থান ও টেকসই উন্নয়নের দাবি তুলছেন।
চরাঞ্চল মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় নির্বাচনী তদারকি প্রশাসনের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। তবে জেলা নির্বাচন অফিস জানিয়েছে, দুর্গম এলাকাসহ সব কেন্দ্রে অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই আসনে মোট নয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন— বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের ফারুক আলম সরকার, জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের আব্দুল ওয়ারেছ, জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকের শামীম হায়দার পাটোয়ারী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা প্রতীকের আজিজুল ইসলাম, বাসদ (মার্কসবাদী)-এর কাঁচি প্রতীকের রাহেলা খাতুন, সিপিবির কাস্তে প্রতীকের শ্রী নির্মল এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হাঁস প্রতীকের নাহিদুজ্জামান নিশাদ, মোটরসাইকেল প্রতীকের এ এইচ এম গোলাম শহীদ রঞ্জু ও ঘোড়া প্রতীকের হাসান মেহেদী বিদ্যুৎ।
জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এই আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৫ হাজার ২৬১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৯২ হাজার ২৭৭ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৯২ হাজার ৯৮১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন তিনজন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ১৪৬টি ভোটকেন্দ্রে সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। একই দিনে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বিষয়ে গণভোটও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।