তিস্তা নদীরবুকে চরজুড়ে এখন সবুজের সমারোহ
ফসল চাষে তিস্তার চরে নতুন আশার আলো দেখছেন কৃষকরা
মোঃ নাজিউর রহমান রিজভী, নিউজ ডেস্ক। বাংলার সংবাদ।
একসময় উত্তরাঞ্চলের তিস্তা নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ অনাবাদি বালুচর এখন ফসল ও সবজির সবুজ মাঠে পরিণত হয়েছে, যা চরাঞ্চলে বসবাসরত হাজারো ভূমিহীন কৃষকের জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর ও নীলফামারী—উত্তরের এই পাঁচ জেলার তিস্তা অববাহিকার যে বালুচরগুলো বছরের পর বছর জনশূন্য পড়ে ছিল, সেগুলো এখন ব্যাপকভাবে ফসল চাষের আওতায় এসেছে।
নদী অববাহিকার ১৩টি উপজেলা ও ৪৫টি ইউনিয়নের কৃষকেরা বর্তমানে জেগে ওঠা চরভূমিতে ফসলের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। বছরের পর বছর ধরে তিস্তা নদীর ১১৫ কিলোমিটার নদীভূমি ধীরে ধীরে সবুজ কৃষিজমির মোজাইকে রূপ নিয়েছে।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, একসময় এসব এলাকার চরবাসীরা নদীভাঙনে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে বিশাল এলাকা পানির নিচে ডুবে থাকত, ফলে বহু পরিবার ভূমিহীন হয়ে জীবিকার জন্য সংগ্রাম করত।
তবে বছরের পর বছর পলি জমতে জমতে নদীর তলদেশ থেকে বিশাল বালুচর জেগে ওঠে এবং ধীরে ধীরে তা চাষযোগ্য চরভূমিতে পরিণত হয়। এই সুযোগ দেখে কৃষকেরা—যাদের অনেকেই ভূমিহীন শ্রমিক—বালুমাটিতে ফসল চাষের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এবং কয়েকটি এনজিওর উৎসাহে চরাঞ্চলের কৃষকেরা ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, কুমড়া, আলু, তেলবীজ এবং বিভিন্ন মৌসুমি সবজি চাষ শুরু করেন।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ জেলার তিস্তা নদীর ১১৫ কিলোমিটার নদীভূমি জুড়ে প্রায় ৯০ হাজার হেক্টর জমি রয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরেই প্রায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমি ফসল চাষের আওতায় আনা হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের ধারণা, বর্তমানে প্রায় ৬০ হাজার কৃষক এসব চরভূমিতে কৃষিকাজে নিয়োজিত আছেন, যাদের অধিকাংশই ভূমিহীন বা প্রান্তিক কৃষক।
কৃষকেরা বলেন, বাজারে সবজির বাড়তি দাম তাদের জন্য অতিরিক্ত সুযোগ সৃষ্টি করেছে। অনেক চাষি এখন স্থানীয় বাজারে কচি সবজির চারা ও অপরিণত গাছ বিক্রি শুরু করেছেন, ফলে মূল ফসল তোলার আগেই তারা দ্রুত আয় করতে পারছেন।
সবজির পাশাপাশি সরিষা ও সূর্যমুখীর মতো তেলবীজ চাষেও চরাঞ্চলের বড় অংশের জমি ব্যবহার হচ্ছে, যেগুলোতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগ লাগে।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার চর তাজপুর এলাকার ৬০ বছর বয়সী কৃষক বদিয়ার রহমান বলেন, “আমি এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছি, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এ বছর গাছ খুব ভালো হয়েছে।”
তিনি বলেন, “এ বছর আমরা চরে বিভিন্ন ফসল চাষ করেছি এবং ভালো ফলনের আশা করছি।”
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নের রহমতের চর এলাকার ৬৫ বছর বয়সী কৃষক মাজিবার রহমান বলেন, চরভূমিতে সরিষা ও সূর্যমুখী চাষ দিন দিন লাভজনক হয়ে উঠছে।
তিনি বলেন, “তেলবীজ চাষে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম, তাই কৃষকেরা ভালো লাভ করতে পারেন।”
তিনি আরও বলেন, একসময় অনাবাদি পড়ে থাকা তিস্তা অববাহিকার চরভূমিতে এখন বিপুলসংখ্যক ভূমিহীন কৃষক কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন।
তিনি জানান, “আগের বছরগুলোতে চরাঞ্চলের কৃষকেরা সঠিক দিকনির্দেশনা ও উন্নত চাষপদ্ধতির অভাবে তেলবীজ ও সবজি চাষে প্রত্যাশিত ফলন পেতেন না।”
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চর মহিপুর এলাকার ৬২ বছর বয়সী কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, চরাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
তিনি বলেন, “এ বছর আমরা চরে কুমড়া, ভুট্টা, ধান, সবজি ও তেলবীজ চাষ করেছি। আমাদের চর এখন সবুজে ভরে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “একসময় পরিত্যক্ত এসব বালুচর এখন ফসল দিচ্ছে—এতে আমরা খুব খুশি। এ বছর ভালো লাভের আশা করছি।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তারা জানান, চরভূমিকে চাষের আওতায় আনতে তারা সক্রিয়ভাবে কৃষকদের উৎসাহিত করছেন।
মোঃ নাজিউর রহমান রিজভী, নিজস্ব প্রতিবেদক, বাংলার সংবাদ।
রংপুর আঞ্চলিক ডিএই-এর অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, কৃষি কর্মকর্তারা বালুময় চরভূমিকে ফসল চাষে ব্যবহার করতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছেন।
তিনি বলেন, “এ বছর এসব চরভূমি থেকে বিপুল পরিমাণ ফসল উৎপাদিত হবে, যা দেশের খাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।”
তিনি আরও বলেন, উন্নত কৃষি পদ্ধতি এবং কৃষকদের বাড়তি অংশগ্রহণের ফলে তিস্তার একসময়কার অনুর্বর বালুচর এখন ধীরে ধীরে উৎপাদনশীল কৃষিভূমিতে পরিণত হচ্ছে—যা উত্তরাঞ্চলের হাজারো চরবাসীর জন্য জীবিকার সুযোগ ও নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করছে।”