মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:০১ অপরাহ্ন

কায়রোতে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, পরিবার সুরক্ষায় বৈশ্বিক ঐক্যের আহ্বান বিশেষ অতিথি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত।

Reporter Name / ২১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬

কায়রোতে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, পরিবার সুরক্ষায় বৈশ্বিক ঐক্যের আহ্বান, বিশেষ অতিথি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

মিশরের রাজধানী কায়রো তে পরিবারকেন্দ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতা জোরদারে বৈশ্বিক সংলাপের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় এর শরিয়া ও আইন অনুষদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হলো ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন, যেখানে পরিবারকে ঘিরে আধুনিক বিশ্বের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের আহ্বান জানানো হয়।

“একটি সুসংহত সমাজ গঠন, আধুনিক চ্যালেঞ্জে পরিবারকে রক্ষা” শীর্ষক এই সম্মেলন ১৮–১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে নাসর সিটির আল-আজহার কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনটি আয়োজিত হয় ড. আহমদ আত-তায়্যেব–এর পৃষ্ঠপোষকতায়, যা এর গুরুত্ব ও আন্তর্জাতিক মর্যাদাকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যায়।

উদ্বোধনী অধিবেশনে অংশ নেন মিশরের ওয়াকফ ও ধর্মমন্ত্রী ড. ওসামা আল-আজহারি–সহ দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা আলেম, আইনবিদ ও গবেষকরা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মিস সামিনা নাজ, যিনি সম্মেলনে অংশগ্রহণরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

রাষ্ট্রদূত তাঁর বক্তব্যে পরিবারকে সমাজের মূলভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় অপরিহার্য। তিনি ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক কাঠামোর গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, মা-বাবা ও সন্তানকেন্দ্রিক পরিবারব্যবস্থাকে জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাবনায় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশসহ বহু দেশ একই অবস্থানে রয়েছে।

সম্মেলনের পূর্বে রাষ্ট্রদূত মিশরের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও একাডেমিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি বৃদ্ধি ও শিক্ষা-সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।

সম্মেলনে ব্রুনাই, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাহরাইন ও সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতগণও অংশগ্রহণ করেন, যা এটিকে একটি প্রকৃত আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত করে।

উদ্বোধনী অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষস্থানীয় আলেম ও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্বরা, যার মধ্যে রয়েছেন ড. মুহাম্মদ আবদুর রহমান আদ-দুওয়াইনি, ড. নাযির আয়্যাদ, ড. সালাম দাউদ, ড. আলী জুমা, ড. শাওকি আল্লাম এবং ড. নাসর ফারিদ ওয়াসিল।

সম্মেলনের সভাপতি অধ্যাপক ড. আতা আবদুল আতি আস-সানবাতি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল প্রভাবের কারণে পরিবার আজ বহুমাত্রিক সংকটে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সম্মেলনে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক বিষয়ের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যা পরিবার রক্ষার কৌশল নির্ধারণে সহায়ক হবে।

ধর্মমন্ত্রী ড. ওসামা আল-আজহারি পরিবারকে একটি পবিত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, সমাজের স্থিতিশীলতা রক্ষায় আলেম ও দাওয়াহকর্মীদের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।

সম্মেলনের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্দোনেশিয়ার প্রফেসর ড. মাশদুর হাতুন, যেখানে তিনি নববী দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবার রক্ষার গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেন। বিভিন্ন সেশনে বক্তারা পরিবারকে “সমাজের সুরক্ষিত দুর্গ” হিসেবে উল্লেখ করে নৈতিকতা, শিক্ষা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। ইসলামিক ল’ বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিব আল হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক এই প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে তিনি গর্বিত এবং অর্জিত জ্ঞান দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অন্য শিক্ষার্থীরাও রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিকে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন।

দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনে মোট ছয়টি বৈজ্ঞানিক সেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকরা তাদের গবেষণা উপস্থাপন করেন। সম্মেলনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রের আইন সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর, যা একাডেমিক ও আইনগত সমন্বয় জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সমাপনী অধিবেশনে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ সাদিক ১৮ দফা সুপারিশ উপস্থাপন করেন। এতে পারিবারিক আইন সংস্কার, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি, বিয়ের পূর্ব প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ব্যবস্থায় পারিবারিক মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্তি, ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।

ইসলামি শরিয়া ও আইন অনুষদের শিক্ষাসচিব ও তথ্যকেন্দ্রের প্রধান প্রফেসর ড. আবদুর রহমান আশরাফ জানান, ধারাবাহিকভাবে ষষ্ঠবারের মতো এই আন্তর্জাতিক আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য পরিবারভিত্তিক সামাজিক মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা।

দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন ১৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় ১৮ দফা সুপারিশ ঘোষণার মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিবারকেন্দ্রিক সামাজিক কাঠামোকে শক্তিশালী করতে এই সম্মেলন একটি কার্যকর বৈশ্বিক দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category