জিও ব্যাগ ফেলেও থামছে না ব্রহ্মপুত্রের তীররক্ষা বাঁধের ধস
বাঁধের পাশেই বেড়েছে নদেরগভীরতা, আতঙ্কে চিলমারীবাসী
বাঁধের ধস ৩০ মিটার থেকে প্রায় ৩০০ মিটার বিস্তৃত হয়েছে
আরমান হোসেন রাজ
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীররক্ষা বাঁধে ভয়াবহ ধস অব্যাহত রয়েছে। বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ধসের হাত থেকে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। তবে স্থানীয়দের দাবি, সেই চেষ্টা এখন পর্যন্ত কার্যকর হচ্ছে না। বরং বাঁধের পাশেই নদীর গভীরতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জিও ব্যাগ ফেলামাত্রই সেগুলো তলিয়ে যাচ্ছে। এতে একের পর এক ধসে পড়ছে কংক্রিটের (সিসি) ব্লক এবং বাঁধের ধস বিস্তৃতি দ্রুত বাড়ছে।
স্থানীয়রা জানান, গত ১৫ জুলাই থেকে উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের কাচকোল ও সড়কটারী এলাকায় তীররক্ষা বাঁধের ধস শুরু হয়। প্রথমদিকে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ মিটার এলাকায় ক্ষয় দেখা দিলেও কয়েক দিনের ব্যবধানে তা বেড়ে প্রায় ৩০০ মিটারে পৌঁছেছে। ধস ঠেকাতে ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা শুরু করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কিন্তু নদীর তলদেশে গভীর গর্ত তৈরি হওয়ায় জিও ব্যাগগুলো স্থায়ীভাবে অবস্থান নিতে পারছে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি জিও ব্যাগে ২৫০ কেজি বালু ভরার কথা থাকলেও অনেক ব্যাগে ২০০ কেজির বেশি বালু দেওয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি নিম্নমানের জিও ব্যাগ ব্যবহারেরও অভিযোগ রয়েছে। জিও ব্যাগগুলো পরিকল্পিতক=ভাবে না ফেলার কারনে এগুলো তেমন কাজে আসছে না। এতে ধস কমার পরিবর্তে আরও তীব্র হচ্ছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্য্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে বর্ষার বাকি সময়ে তীররক্ষা বাঁধের ধস আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এতে শুধু তীররক্ষা বাঁধই নয়, চিলমারী উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ, কৃষিজমি, বসতভিটা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। তীররক্ষা বাঁধে ধস দেখা দেওয়ায় বাঁধের আশপাশের গ্রামের লোকজনের নির্ঘুম রাত কাটছে।
কাচকোল গ্রামের কৃষক নিজাম উদ্দিন (৫৫) বলেন, “বুধবার যে ধস ৩০-৩৫ মিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা প্রায় ৩০০০ মিটারে ছড়িয়ে পড়েছে। এই বাঁধ শুধু নদীর তীর রক্ষা করে না, পুরো চিলমারী উপজেলার সুরক্ষা নিশ্চিত করে। বাঁধটি ভেঙে গেলে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যা ও নদীভাঙনের মুখে পড়বে।”
তিনি অভিযোগ করে বলেন, “জিও ব্যাগ ফেলার কাজে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে। বাস্তবে যত ব্যাগ ফেলা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি দেখিয়ে বিল তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড চাইলে আমরা স্থানীয়রাও স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। যেকোনো মূল্যে এই বাঁধ রক্ষা করতে হবে।”
সড়কটারী গ্রামের কৃষক শামসুল ইসলাম (৬৫) বলেন, “জিও ব্যাগ ফেলার পরও বাঁধে ধস থামছে না, বরং প্রতিদিন বাড়ছে। সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে, কিন্তু তার সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। নিম্নমানের জিও ব্যাগ ও কম বালু ব্যবহার করায় কাজের কার্যকারিতা নেই। এতে কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় একটি চক্র লাভবান হচ্ছে।”
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, “স্থানীয়দের অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমি নিজে সার্বক্ষণিক কাজ তদারকি করছি। পাউবোর কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই ঠিকাদার নির্ধারিত ওজন অনুযায়ী বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলছে। ব্যবহৃত জিও ব্যাগ ল্যাব পরীক্ষায় মানসম্মত প্রমাণিত হয়েছে।”
তিনি জানান, জরুরি ভিত্তিতে ১৮ হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শনিবার বিকেল পর্যন্ত প্রায় ১৪ হাজার জিও ব্যাগে বালু ভরে ভাঙনকবলিত স্থানে ফেলা হয়েছে এবং কাজ এখনও চলমান রয়েছে।
রাকিবুল হাসান বলেন, “বাঁধসংলগ্ন ব্রহ্মপুত্রের তলদেশে গভীরতা অনেক বেড়ে গেছে। এজন্য জিও ব্যাগ ফেলামাত্রই সেগুলো নদের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে। এখানে কাজের মান নিয়ে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। বিশেষজ্ঞ দল নদের গভীরতা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ করছে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন কর্তৃপক্ষ। পরে নতুন প্রকৌশল নকশা অনুযায়ী স্থায়ীভাবে বাঁধ সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”