রংপুর নগরীর লাইফলাইনখ্যাত ঐতিহাসিক শ্যামাসুন্দরী খালকে দখল ও দূষণমুক্ত করে পুনঃখননের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন পরিবেশকর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকরা। একইসঙ্গে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় তিস্তা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণের দাবি জানানো হয়েছে।
শনিবার সকালে রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর অনুপ্রেরণায় গঠিত সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), রংপুর এ মানববন্ধনের আয়োজন করে। এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল— “পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন: এখনই সময় নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরে কার্যকর পদক্ষেপের।”
প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়ে পরিবেশ সুরক্ষার দাবিতে সংহতি প্রকাশ করেন। বক্তারা বলেন, এক সময় রংপুর নগরীর প্রাণ হিসেবে পরিচিত শ্যামাসুন্দরী খাল বর্তমানে অবৈধ দখল, দূষণ ও নাব্যতা সংকটে অস্তিত্ব হারানোর পথে। খালটি রক্ষা করতে হলে অবিলম্বে দখলমুক্ত করা, দূষণ বন্ধ করা এবং পরিকল্পিতভাবে পুনঃখননের উদ্যোগ নিতে হবে।
সনাক রংপুরের সভাপতি ড. শাশ্বত ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সনাক সদস্য অধ্যাপক শাহ আলম, স্বর্ণনারী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মন্জুশ্রী সাহা, জনস্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলন বাংলাদেশের আহ্বায়ক বেলাল আহমেদ, টিআইবির রংপুর ক্লাস্টারের কো-অর্ডিনেটর কমল কৃষ্ণ সাহা এবং তরুণ প্রতিনিধি ও ইয়েস দলনেতা বিক্রম কুমার শর্মা।
ইয়েস সদস্য তাসলিমা আক্তার মিমের সঞ্চালনায় বক্তারা বলেন, পরিবেশ বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দিন দিন তীব্র হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের নদ-নদী, জলাভূমি ও কৃষি ব্যবস্থা ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অপরিহার্য।
বক্তারা আরও বলেন, তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় উত্তরাঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই তিস্তা নদীর ন্যায্য পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা, তিস্তা ব্যারেজের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনার আওতায় পানি ও বিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
মানববন্ধনে পরিবেশ সংরক্ষণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ, নগরীর কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, পরিবেশবান্ধব বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে সরকারি নীতিগত সহায়তা এবং পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ।
এ সময় অংশগ্রহণকারীরা পরিবেশ সুরক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন এবং টিআইবির প্রস্তুতকৃত ধারণাপত্র বিতরণ করা হয়।
মানববন্ধনে টিআইবি ও সনাকের পক্ষ থেকে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ১২ দফা সুপারিশও তুলে ধরা হয়। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরের জন্য সময়োপযোগী জ্বালানি নীতি প্রণয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ ও প্রণোদনা বৃদ্ধি, স্থানীয়ভাবে প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদার করা, পরিবেশ আদালতের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, পরিবেশবিষয়ক অপরাধ দমনে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ, জলাভূমি দখল ও বন উজাড় বন্ধ, প্লাস্টিক দূষণ রোধে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি, দুর্যোগকালীন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রটোকল প্রণয়ন এবং পরিবেশ ও জ্বালানি খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।