শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১৫ পূর্বাহ্ন
Headline :
১৭ এপ্রিল: মুজিবনগর দিবসের চেতনা ও ইতিহাসের দায়বদ্ধতা ——মানিক লাল ঘোষ—– ​বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জন মহান স্বাধীনতা। আর এই স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য মাইলফলক ১৭ এপ্রিল—ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে তদানীন্তন কুষ্টিয়া জেলার, বর্তমান মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে। ১৭ এপ্রিলের শপথ গ্রহণের প্রেক্ষাপট মূলত রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল। এদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ গঠন করা হয় এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Proclamation of Independence) জারি করা হয়। ১০ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল—এই অন্তর্বর্তী সময়েও রাষ্ট্রপরিচালনার সমস্ত দিকনির্দেশনা আসছিল বঙ্গবন্ধুর সত্তা ও তাঁর পূর্বঘোষিত আদর্শ থেকে। যদিও বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি, কিন্তু তাঁর বজ্রকণ্ঠ আর আজীবন সংগ্রামের অনুপ্রেরণাই ছিল এই সরকারের মূল শক্তি। ​মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার লক্ষ্যে গঠিত এই ঐতিহাসিক মন্ত্রিসভার রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তাজউদ্দীন আহমদ। এছাড়া এম মনসুর আলী অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনি খন্দকার মোশতাক আহমেদও মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। ​মুজিবনগর সরকার গঠন ছিল নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আইনি ও রাজনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ। এই সরকারের নেতৃত্বেই নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ১৭ এপ্রিলের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই বিশ্ববাসী জানতে পারে—বাংলাদেশ কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, বরং একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্র। ​দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিশেষ করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতিসৌধসহ মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মারকে হামলা ও ভাঙচুর এবং ইতিহাসের অবমাননার ঘটনা আমাদের মর্মাহত করেছে। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়; এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব এবং স্বাধিকার আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক। যেকোনো রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু জাতীয় ইতিহাসের শিকড় উপড়ে ফেলার চেষ্টা জাতি হিসেবে আমাদের দেউলিয়া হওয়ারই পরিচয় দেয়। একটি স্থাপনা ভাঙা মানে কেবল স্থাপত্যশৈলী ধ্বংস করা নয়, বরং সেই ঐতিহাসিক ক্ষণটিকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা, যা লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। ইতিহাস কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি সমগ্র জাতির দর্পণ। ​বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের দায়বদ্ধতা আরও বেড়েছে। ইতিহাসকে রাজনৈতিক মেরুকরণের ঊর্ধ্বে রাখা জরুরি। ক্ষমতার পরিবর্তন হবে, সরকার বদলাবে; কিন্তু ১৭ এপ্রিল বা ১০ এপ্রিলের মতো ঐতিহাসিক ভিত্তিগুলো ধ্রুব। এগুলোর ওপর আঘাত হানার অর্থ হলো নিজেদের ভিত্তিকে দুর্বল করা। মুজিবনগর দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রতিকূলতার মধ্যেও কীভাবে একটি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে আনতে পারে। ভাঙচুর বা বিদ্বেষের মাধ্যমে কোনো মহান ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না। বরং ইতিহাসের সত্যকে গ্রহণ করেই আমাদের আগামীর পথ চলতে হবে। আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে আমাদের শপথ হওয়া উচিত—জাতীয় সম্পদ ও ইতিহাস রক্ষা করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুসংহত বাংলাদেশ গড়ার। ​(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি) দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায় মাদক সেবনের অভিযোগে এক যুবককে আটক করে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পানি নিষ্কাশন ও সুইজ গেটের দাবিতে মোরেলগঞ্জে মানববন্ধন। লালমনিরহাটে প্রতিপক্ষের হামলায় চিকিৎসাধীন যুবকের মৃত্যু ,এলাকায় শোকের ছায়া। রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা দিলেন আদিতমারী উপজেলা আ.লীগের সহ-সভাপতি আব্দুস সোহরাব। গাবতলী সোনাকানিয়া হিজাবুন নূর বালিকা দাখিল মাদ্রাসায় বিদায়ী সংবর্ধনা ও দোয়া মাহফিলে সাবেক এমপি লালু। ভোগনগরে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের ৭১ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি। দেশবন্ধু রেমিটেন্স যোদ্ধা সংসদ নিউক্যাসেল শাখা ইউকের ২১ সদস‍্য কমিটি গঠন রাজবাড়ীতে অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি, অপহৃতকে উদ্ধারসহ গ্রেফতার ৫। ১০০ পিস ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার।

কুমিল্লায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার ভয়ে পালিয়ে বেড়ানো এক নির্যাতিতা গৃহবধূর সংবাদ সম্মেলন

Reporter Name / ৬১ Time View
Update : শুক্রবার, ২৮ জুন, ২০২৪

(কুমিল্লা) প্রতিনিধি।

কুমিল্লায় স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতার ধর্ষণচেষ্টার ভয়ে পরিবার নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন এক গৃহবধূ। বৃহস্পতিবার (২৭ জুন) দুপুরে দেবিদ্বার পৌরসভার একটি হোটেলের হলরুমে সংবাদ সম্মেলন করেন নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ ও তাঁর পরিবারের লোকজন।

অভিযুক্ত স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতার নাম লিটন সরকার। তিনি বরকামতা ইউনিয়নের বাগুর গ্রামের মৃত আব্দুল মজিদ মিয়ার ছেলে। বর্তমানে তিনি কুমিল্লা উত্তর জেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাধারণ সম্পাদক।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ওই গৃহবধূ দাবি করেন, গত ১ জুন রাত সাড়ে ১০টার দিকে লিটন সরকার আমার স্বামীর অবর্তমানে ঘরে জোর করে প্রবেশ করে আমার স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে জোর করে ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। তাকে অনুরোধ ও নিষেধ করলে সে আমাকে বিভিন্ন ভয়ভীতি ও প্রাণে মেরে লাশ গুমের হুমকি দেয়, আমার চিৎকার শুনে আমার স্বামী ঘরে আসলে সে পিছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যায়। তাঁর কাছে আমার স্বামীর স্বাক্ষরিত ৪টি ব্যাংক চেক রয়েছে ঘটনার পর থেকে সে ওই চেক দিয়ে আমার স্বামীর নামে চেক জালিয়াতির মামলা করার হুমকি দেয়। স্থানীয় প্রভাবশালী একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি তাকে সেল্টার দিচ্ছে। তার নামে আদালতে হত্যাসহ প্রায় এক ডজনের ওপর মামলা চলমান আছে।

লিখিত বক্তব্যে ওই গৃহবধু আরও বলেন, আমার দুটি সন্তান ও স্বামী নিয়ে লিটন সরকার ও তার পালিত গুন্ডাবাহিনীর ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। তাঁরা একের পর এক আমাকে হুমকি ধামকি দিচ্ছে। আমি আজ নিরুপায় হয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। দয়া করে আপনারা আমার পাশে দাঁড়ান, আমি থানা পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি, কিন্তু অদৃশ্য শক্তির কারণে আমার মামলা এখনও নথিভুক্ত করা হয়নি। আমি আমার স্বামী ও দুই সন্তানের প্রাণ ভিক্ষা চাই। তার হাত থেকে আমাদের বাঁচান।

সংবাদ সম্মেলনে ওই গৃহবধূর বড় ভাই নাইম হোসেন বলেন, লিটন সরকারে বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। যে তার বিরুদ্ধে মুখ খুলে তার নামেই তিনি মামলা দিয়ে হয়রানি করে। আমার বোনের এই ঘটনার প্রতিবাদ করায় আমার নামেও মামলা দেয়। আমরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে একটি সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।

ভয়ে এলাকাছাড়া গৃহবধূর পরিবার :
ভুক্তভোগী গৃহবধূর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় লিখিত অভিযোগের পর বিভিন্নভাবে হুমকি–ধমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই গৃহবধূর বড় ভাই নাঈম হোসেন বলেন, আমাদের বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তাদের ভয়ে পরিবারের সদস্যরা এলাকাছাড়া। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

১৭ এপ্রিল: মুজিবনগর দিবসের চেতনা ও ইতিহাসের দায়বদ্ধতা ——মানিক লাল ঘোষ—– ​বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জন মহান স্বাধীনতা। আর এই স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য মাইলফলক ১৭ এপ্রিল—ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে তদানীন্তন কুষ্টিয়া জেলার, বর্তমান মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে। ১৭ এপ্রিলের শপথ গ্রহণের প্রেক্ষাপট মূলত রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল। এদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ গঠন করা হয় এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Proclamation of Independence) জারি করা হয়। ১০ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল—এই অন্তর্বর্তী সময়েও রাষ্ট্রপরিচালনার সমস্ত দিকনির্দেশনা আসছিল বঙ্গবন্ধুর সত্তা ও তাঁর পূর্বঘোষিত আদর্শ থেকে। যদিও বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি, কিন্তু তাঁর বজ্রকণ্ঠ আর আজীবন সংগ্রামের অনুপ্রেরণাই ছিল এই সরকারের মূল শক্তি। ​মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার লক্ষ্যে গঠিত এই ঐতিহাসিক মন্ত্রিসভার রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তাজউদ্দীন আহমদ। এছাড়া এম মনসুর আলী অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনি খন্দকার মোশতাক আহমেদও মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। ​মুজিবনগর সরকার গঠন ছিল নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আইনি ও রাজনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ। এই সরকারের নেতৃত্বেই নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ১৭ এপ্রিলের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই বিশ্ববাসী জানতে পারে—বাংলাদেশ কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, বরং একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্র। ​দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিশেষ করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতিসৌধসহ মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মারকে হামলা ও ভাঙচুর এবং ইতিহাসের অবমাননার ঘটনা আমাদের মর্মাহত করেছে। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়; এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব এবং স্বাধিকার আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক। যেকোনো রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু জাতীয় ইতিহাসের শিকড় উপড়ে ফেলার চেষ্টা জাতি হিসেবে আমাদের দেউলিয়া হওয়ারই পরিচয় দেয়। একটি স্থাপনা ভাঙা মানে কেবল স্থাপত্যশৈলী ধ্বংস করা নয়, বরং সেই ঐতিহাসিক ক্ষণটিকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা, যা লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। ইতিহাস কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি সমগ্র জাতির দর্পণ। ​বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের দায়বদ্ধতা আরও বেড়েছে। ইতিহাসকে রাজনৈতিক মেরুকরণের ঊর্ধ্বে রাখা জরুরি। ক্ষমতার পরিবর্তন হবে, সরকার বদলাবে; কিন্তু ১৭ এপ্রিল বা ১০ এপ্রিলের মতো ঐতিহাসিক ভিত্তিগুলো ধ্রুব। এগুলোর ওপর আঘাত হানার অর্থ হলো নিজেদের ভিত্তিকে দুর্বল করা। মুজিবনগর দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রতিকূলতার মধ্যেও কীভাবে একটি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে আনতে পারে। ভাঙচুর বা বিদ্বেষের মাধ্যমে কোনো মহান ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না। বরং ইতিহাসের সত্যকে গ্রহণ করেই আমাদের আগামীর পথ চলতে হবে। আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে আমাদের শপথ হওয়া উচিত—জাতীয় সম্পদ ও ইতিহাস রক্ষা করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুসংহত বাংলাদেশ গড়ার। ​(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)

১৭ এপ্রিল: মুজিবনগর দিবসের চেতনা ও ইতিহাসের দায়বদ্ধতা ——মানিক লাল ঘোষ—– ​বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অর্জন মহান স্বাধীনতা। আর এই স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য মাইলফলক ১৭ এপ্রিল—ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে তদানীন্তন কুষ্টিয়া জেলার, বর্তমান মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে। ১৭ এপ্রিলের শপথ গ্রহণের প্রেক্ষাপট মূলত রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল। এদিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার’ গঠন করা হয় এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Proclamation of Independence) জারি করা হয়। ১০ এপ্রিল থেকে ১৭ এপ্রিল—এই অন্তর্বর্তী সময়েও রাষ্ট্রপরিচালনার সমস্ত দিকনির্দেশনা আসছিল বঙ্গবন্ধুর সত্তা ও তাঁর পূর্বঘোষিত আদর্শ থেকে। যদিও বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি, কিন্তু তাঁর বজ্রকণ্ঠ আর আজীবন সংগ্রামের অনুপ্রেরণাই ছিল এই সরকারের মূল শক্তি। ​মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার লক্ষ্যে গঠিত এই ঐতিহাসিক মন্ত্রিসভার রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তাজউদ্দীন আহমদ। এছাড়া এম মনসুর আলী অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত খুনি খন্দকার মোশতাক আহমেদও মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। ​মুজিবনগর সরকার গঠন ছিল নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আইনি ও রাজনৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ। এই সরকারের নেতৃত্বেই নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ১৭ এপ্রিলের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই বিশ্ববাসী জানতে পারে—বাংলাদেশ কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, বরং একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্র। ​দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বিশেষ করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতিসৌধসহ মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন স্মারকে হামলা ও ভাঙচুর এবং ইতিহাসের অবমাননার ঘটনা আমাদের মর্মাহত করেছে। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপনা নয়; এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব এবং স্বাধিকার আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক। যেকোনো রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু জাতীয় ইতিহাসের শিকড় উপড়ে ফেলার চেষ্টা জাতি হিসেবে আমাদের দেউলিয়া হওয়ারই পরিচয় দেয়। একটি স্থাপনা ভাঙা মানে কেবল স্থাপত্যশৈলী ধ্বংস করা নয়, বরং সেই ঐতিহাসিক ক্ষণটিকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা, যা লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। ইতিহাস কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি সমগ্র জাতির দর্পণ। ​বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের দায়বদ্ধতা আরও বেড়েছে। ইতিহাসকে রাজনৈতিক মেরুকরণের ঊর্ধ্বে রাখা জরুরি। ক্ষমতার পরিবর্তন হবে, সরকার বদলাবে; কিন্তু ১৭ এপ্রিল বা ১০ এপ্রিলের মতো ঐতিহাসিক ভিত্তিগুলো ধ্রুব। এগুলোর ওপর আঘাত হানার অর্থ হলো নিজেদের ভিত্তিকে দুর্বল করা। মুজিবনগর দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রতিকূলতার মধ্যেও কীভাবে একটি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে আনতে পারে। ভাঙচুর বা বিদ্বেষের মাধ্যমে কোনো মহান ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না। বরং ইতিহাসের সত্যকে গ্রহণ করেই আমাদের আগামীর পথ চলতে হবে। আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে আমাদের শপথ হওয়া উচিত—জাতীয় সম্পদ ও ইতিহাস রক্ষা করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুসংহত বাংলাদেশ গড়ার। ​(মানিক লাল ঘোষ: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সহ-সভাপতি)