শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৩ অপরাহ্ন
Headline :
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন লালমনিরহাট-২ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য গণমানুষের নেতা জনাব মোঃ রোকন উদ্দিন বাবুল মহোদয়। প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ। মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে মইনীয়া যুব ফোরামের মানববন্ধন:সকল স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান । বগুড়া গাবতলিতে বাঁশ কাটা নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে ৮০ (আশি) বছরের বৃদ্ধা সহ৩জন আহত। রংপুরে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে সেচ এক মৌসুমে সাশ্রয় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল, কৃষকের মুখে হাসি। বালিয়াড়িতে অবৈধ প্লট বাণিজ্যের অভিযোগ। কাঠালিয়ায় গৃহ কষ্টে ভুগছে ৪ সন্তানের জননী মুন্নি বেগম। প্রেস বিজ্ঞপ্তি অবৈধভাবে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের দায়ে একেএইচ লজিস্টিকসকে জরিমানা

রংপুরে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে সেচ এক মৌসুমে সাশ্রয় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল, কৃষকের মুখে হাসি।

Reporter Name / ১৪ Time View
Update : শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

রংপুরে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে সেচ
এক মৌসুমে সাশ্রয় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল, কৃষকের মুখে হাসি

আরমান হোসেন রাজু, বিভাগীয় প্রতিনিধি রংপুর, বাংলার সংবাদ।

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা, সরবরাহ শঙ্কা এবং দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতির আশঙ্কার মধ্যে বাংলাদেশের কৃষিখাতেও চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে সেচ মৌসুমে ডিজেলনির্ভর কৃষকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এমন বাস্তবতায় রংপুর অঞ্চলে আশার আলো হয়ে উঠেছে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ ব্যবস্থা। সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫ দশমিক ৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এতে একেকটি সেচ মৌসুমে প্রায় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল সাশ্রয় সম্ভব হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষকেরা বলছেন, ডিজেল সংকট, মূল্যবৃদ্ধি কিংবা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ভোগান্তি ছাড়াই এখন সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন খরচ কমছে, বাড়ছে আবাদও।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধাউপজেলার গড্ডিমারী ইআুনিয়নের দোয়ানী গ্রামে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) পরিচালিত একটি ডাগওয়েলের দায়িত্বে আছেন আতিয়ার রহমান।
তিনি বলেন, এলাকায় ব্যাপকভাবে ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজি চাষ হয়। এই সৌরচালিত সেচযন্ত্র দিয়ে প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে নিয়মিত পানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
তিনি জানান, “ডিজেল পাওয়া না গেলে বা দাম বাড়লেও কৃষকদের এখন আর চিন্তা করতে হয় না। কারণ এই সেচযন্ত্র চলে সৌরবিদ্যুতে।”
তবে তিনি একটি বড় সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন। বছরে মাত্র চার মাস সেচ কাজে ব্যবহারের পর বাকি আট মাস সোলার প্যানেলগুলো প্রায় অব্যবহৃত পড়ে থাকে। এই সময়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে নেট মিটারিং ব্যবস্থা চালু করা গেলে কৃষক, প্রতিষ্ঠান ও সরকার—সবাই লাভবান হতে পারে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি পাম্প চালিয়ে কৃষিজমিতে পানি পৌঁছে দিচ্ছে। কোথাও ডিজেলের ধোঁয়া নেই, নেই জ্বালানি সংগ্রহের দৌড়ঝাঁপ, নেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার উৎকণ্ঠা।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর গ্রামের কৃষক সুধান চন্দ্র সেন বলেন, “তেলের চিন্তা নাই। সোলার থেকে বিদ্যুৎ হয়, পানি পাই। ফসলও ভালো হয়, খরচও কম লাগে।”
তিনি আরো বলেন, “আগে বিদ্যুৎ থাকতো আবার থাকতো না। অনেক সময় জমিতে পানি দিতে দেরি হতো। এখন সোলারে সবসময় পানি পাওয়া যায়।”

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার চর পশ্চিম বজরা এলাকার কৃষক মেহের জামাল বলেন, তিস্তা নদীবেষ্টিত বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে একসময় সেচের অভাবে শত শত একর জমি অনাবাদি পড়ে থাকত। সামর্থ্যবান কৃষকেরা ব্যক্তিগতভাবে শ্যালোমেশিন বসিয়ে চাষাবাদের চেষ্টা করতেন। এতে খরচ বাড়ত, পরিশ্রমও বেশি লাগত।
তিনি বলেন, “কয়েক বছর ধরে সৌরবিদ্যুতের সেচ সুবিধা পাওয়ায় এখন চরের অনেক জমিতে নিয়মিত চাষ হচ্ছে। আগে যে জমি পড়ে থাকতো, এখন সেখানে ফসল ফলছে।”

নদী বাঁচাও তিস্তা বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের লালমনিরহাট জেলা ইউনিটের সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষিকে আধুনিক করার জন্য এ ধরনের প্রকল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্য পরিবর্তনে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সৌরচালিত সেচ প্রকল্প আরও বাড়ানো দরকার।”

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী (নির্মাণ) প্রকৌশলী হুসাইন মোহাম্মদ আলতাফ জানান, ২০২২ সালের পর নতুন কোনো সৌর সেচ প্রকল্প চালু হয়নি। তবে আগের স্থাপনাগুলো এখনো সচল রয়েছে।
তিনি বলেন, গত সেচ মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ৫৯৬টি সৌরচালিত সেচযন্ত্র সচল ছিল। প্রতিটি যন্ত্রে গড়ে ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরা হলে মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯৬০ কিলোওয়াট বা ৫ দশমিক ৯ মেগাওয়াট। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ হাজার ফ্যান চালানো সম্ভব। একই সঙ্গে চার মাসের সেচ মৌসুমে প্রায় ৭৫ লাখ লিটার ডিজেল সাশ্রয় হয়।

বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)-এর রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান খান বলেন, তাদের আওতায় নতুন প্রকল্প না এলেও পুরোনো প্রকল্প চালু আছে। মাঠ পর্যায়ে দুটি নেট মিটারিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এছাড়া অফিস ভবনের সৌর বিদ্যুৎও নেট মিটারিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে।

নেসকো রংপুরের প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) মিজানুর রহমান ডিজেলনির্ভর সেচ থেকে সৌরচালিত সেচে দ্রুত রূপান্তর ঘটাতে পারলে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণও কমবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটি হতে পারে টেকসই কৃষির কার্যকর পথ। ‘অধিকাংশ সৌরচালিত সেচযন্ত্র পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকায় রয়েছে। তাই এসব স্থাপনায় নেট মিটারিং চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলে বাস্তবায়ন সম্ভব,’ তিনি বলেন।

কৃষকদের দাবি—নতুন করে সৌর সেচ প্রকল্প চালু হোক, পুরোনো প্রকল্প সংস্কার হোক, আর অব্যবহৃত সময়ের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হোক। কারণ, “সূর্যের আলো যদি মাঠে ফসল ফলায়, তবে সেই আলো দেশের বিদ্যুতের ঘাটতি পুরন করতে পারবে,’ তারা বলেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category