বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৩৬ পূর্বাহ্ন
Headline :
রংপুর সদরে আদালতের রায় অমান্য করে মসজিদের জমিতে ঘর নির্মাণের অভিযোগ ঐতিহ্যবাহী ফেকামারা কামিল মাদ্রাসা অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ–২০২৬: গাইবান্ধায় শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান নির্বাচিত মো. নওয়াব আলী প্রধান দেবহাটায় এক যুবককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন : জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে নির্যাতিত যুবক : আইনী সহযোগিতার আশ্বাস পুলিশের বেগম খালেদা জিয়া রূহের মাগফিরাত কামনায় তুরাগে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল নাফ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ টেকনাফের জেলে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, ময়মনসিংহ এবং রিটার্নিং অফিসারগন, পরিদর্শন করেন চাঁপাই মৎস্যচাষী সমবায় সমিতির সভাপতি ওবাইদুল সম্পাদক-সোহেল টেকনাফে আনসার ব্যাটালিয়নের অভিযানে নুর কামাল গ্রুপের দুই ডাকাত আটক বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় বগুড়া গাবতলী মহিষাবান ইউনিয়ন দলীয় কার্যালয় দোয়াও মাহাফিল

বাঙালি জাতীয়তাবাদ বনাম মুসলিম জাতীয়তাবাদ: আত্মপরিচয়ের সংঘাত ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা

Dr. M. G. Mostafa Musa / ১৬ Time View
Update : রবিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২৬

 

_একটি অত্যন্ত গভীর এবং সংবেদনশীল ঐতিহাসিক ও চেতনার প্রশ্ন: “বাঙালি জাতীয়তাবাদ বনাম মুসলিম জাতীয়তাবাদ”, যা শুধু রাজনৈতিক মতভেদ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের জাতিসত্তা, ধর্মীয় পরিচয় ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচেতনার মূলে থাকা এক দার্শনিক সংঘাত।_

উত্থাপিত বিষয়ের দুটি পয়েন্টের ভিত্তিতে নিচে একটি বিশ্লেষণ দেওয়া হলো রাজনৈতিক, ইতিহাস, মনস্তত্ত্ব, ভূরাজনীতি, এবং দার্শনিক-চেতনার আলোকে।

*১. বাঙালি জাতীয়তাবাদের বয়ান ও ভারতের ভূমিকা:*

_(ক). ঐতিহাসিক পটভূমি:_ “বাঙালি জাতীয়তাবাদ” ধারণাটি মূলত ১৯৪৭-এর পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে উত্থিত। পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানেরা নিজেদেরকে আগে “মুসলিম” হিসেবে চিহ্নিত করত, “বাঙালি” হিসেবে নয়। কারণ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ও ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব পর্যন্ত মুসলমানদের রাজনৈতিক ঐক্য গঠিত ছিল ধর্মীয় পরিচয়কেন্দ্রিক জাতীয়তাবাদে (Muslim Nationalism)।

কিন্তু ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর একটি নতুন সাংস্কৃতিক চেতনা জন্ম নেয়, “আমরা বাঙালি”, যা মুসলিম চেতনার পাশাপাশি ভাষাভিত্তিক ঐক্যকে সামনে আনে।

এই “বাঙালি জাতীয়তাবাদ” পরে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার রাজনৈতিক ভাষা হয়, তবে এর বীজ ও বয়ানমূল ভারতীয় বুদ্ধিজীবী মহল থেকে প্রভাবিত ছিল।

_(খ). ভারতের কৌশল:_ ভারতের দৃষ্টিতে, পাকিস্তানের “দ্বি-জাতি তত্ত্ব” (Two-Nation Theory) ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ঐক্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। তাই ১৯৪৭-এর পর থেকেই ভারত একটি “ Post-Islamic identity project” হাতে নেয়, যেখানে লক্ষ্য ছিল মুসলিম চেতনার বিকল্প হিসেবে আঞ্চলিক, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করা।

সেই প্রেক্ষিতে “বাঙালি জাতীয়তাবাদ” ভারতের পক্ষে একটি “ Strategic Narrative Tool” হিসেবে কাজ করে: মুসলমানদের ইসলামিক একতা দুর্বল করা, পাকিস্তানকে বিভক্ত করা, এবং পূর্ববাংলাকে ভারতের সাংস্কৃতিক প্রভাববলয়ে (Sphere of influence) টেনে আনা।

এ কারণেই দেখা যায়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ভারতীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক হেজিমনি (hegemony) স্থাপনের প্রচেষ্টা জারি থাকে: মিডিয়া, সাহিত্য, সংগীত, পাঠ্যবই, এমনকি নীতি-আদর্শেও “বাঙালি ঐতিহ্য” নামের আড়ালে ভারতীয় প্রভাব দৃঢ় হয়।

_(গ). বাস্তবতা:_ গত ৫০ বছরে যেভাবে বাংলাদেশের ভারতনির্ভর রাজনীতি ও অর্থনীতি বিকশিত হয়েছে, তাতে বোঝা যায়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রকৃত অর্থে একটি আন্তরিক মুক্তির আন্দোলন নয়, বরং একটি নিয়ন্ত্রিত সাংস্কৃতিক মডেল ছিল, যা ভারতের আঞ্চলিক কৌশল (Regional Strategy) পূরণ করেছে।

“বাঙালি” নামটি আমাদের সাংস্কৃতিক সত্তাকে সংহত করলেও, রাজনৈতিকভাবে এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের বিভাজন রেখা তৈরি করেছে, মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে।

*২. সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম বাংলাদেশে বাঙালি বনাম মুসলিম জাতীয়তাবাদ:*

_(ক). দুই চেতনার সংঘাতের মূল:_ বাংলাদেশের জাতীয় চিন্তা ও পরিচয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে দুটি সমান্তরাল ধারা সক্রিয়, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ।

_বাঙালি জাতীয়তাবাদ:_ বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূখণ্ডকে পরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে, যার মূল প্রভাব রবীন্দ্রনাথ ও ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা থেকে এসেছে। এই মতবাদ ধর্মকে ব্যক্তিগত পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় এবং একটি সেক্যুলার, সাংস্কৃতিক রাষ্ট্র গঠনের আদর্শে বিশ্বাসী। এর সমর্থনশক্তি প্রধানত বামপন্থী, ভারতপন্থী ও নগর-সাংস্কৃতিক অভিজাত গোষ্ঠী।

_মুসলিম জাতীয়তাবাদ:_ অপরদিকে, মুসলিম জাতীয়তাবাদ ঈমান, ধর্ম ও উম্মাহকে জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখে। এটি ইসলামি পুনর্জাগরণের ধারায় উপমহাদেশের মুসলিম রাজনীতির প্রভাব বহন করে, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি হওয়া উচিত ধর্মীয় নীতি ও ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক কাঠামো। এই ধারা সাধারণ জনগণ, ইসলামপ্রেমী শ্রেণি ও ধর্মীয় সমাজের মধ্যে গভীরভাবে প্রোথিত।

১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশে এই দুই চেতনার সংঘাত এক প্রকার অচেতন দ্বৈতচেতনা হিসেবে টিকে আছে, রাষ্ট্রীয় নীতি যেখানে “বাঙালি” পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়, সেখানে সমাজের আবেগ ও নৈতিক অনুভব এখনো “মুসলিম” চেতনায় গভীরভাবে বাঁধা। এই দ্বন্দ্বই বাংলাদেশের জাতীয় মানসিক সংকটের মূল উৎস।

_(খ). মুসলিম জাতীয়তাবাদের দমন:_ ১৯৭২ সালের সংবিধানে “ধর্মনিরপেক্ষতা”কে প্রধান স্তম্ভ করা হয়, যার ফলে ইসলামিক চেতনা রাষ্ট্রচিন্তা থেকে নির্বাসিত হয়। পরে ১৯৭৭ ও ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হলেও, এটি অনেকাংশে প্রতীকী ব্যবস্থা মাত্র। বাস্তবে এখনো প্রশাসন, শিক্ষা, ও সাংস্কৃতিক বয়ানে বাঙালি ধর্মনিরপেক্ষতা প্রাধান্য পায়, যা ভারতীয় নরম প্রভাব (soft power) হিসেবে কাজ করে।

_ফলাফল:_ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও বাংলাদেশের মুসলমানরা সাংস্কৃতিকভাবে আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্বে ভুগছে।

ইসলামি নীতি বা শরিয়াভিত্তিক সমাজচিন্তা আজও বিতর্কিত, প্রান্তিক, এমনকি “সন্দেহভাজন” বিষয় হিসেবে দেখা হয়।

_(গ). মুসলিমদের ভবিষ্যৎ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা:_চ্যালেঞ্জ:_ সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে ইসলামি চেতনার অবমূল্যায়ন। শিক্ষা ও গণমাধ্যমে পশ্চিমা-ভারতীয় চিন্তার প্রভাব। “মুসলিম” পরিচয়কে অগ্রগতির বিপরীতে উপস্থাপন।

_সম্ভাবনা:_ কুরআনভিত্তিক জ্ঞান-আন্দোলনের মাধ্যমে নতুন মুসলিম বুদ্ধিজাগরণ। ইসলামি সামাজিক ন্যায় (আদল, ইহসান, আমানাহ) ধারণার পুনরুজ্জীবন। নতুন প্রজন্মের মধ্যে Faith-based rationalism, যেখানে ঈমান ও যুক্তি একসাথে চলবে।

যদি এই পুনর্জাগরণ সফল হয়, তবে বাংলাদেশ এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে যেখানে বাঙালি পরিচয় থাকবে সাংস্কৃতিক, কিন্তু মুসলিম পরিচয় থাকবে নৈতিক ও নীতিনির্ধারণমূলক।

*উপসংহার:* বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল একটি রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত সাংস্কৃতিক বয়ান, যা মুসলিম জাতীয়তাবাদের ধারাকে দুর্বল করে ভারতীয় প্রভাব বলয়কে প্রবল করেছিল। তবে এখন সময় এসেছে এই দ্বৈত চেতনা থেকে বের হয়ে নতুনভাবে প্রশ্ন করার:

(ক). “আমরা কি বাঙালি হয়ে মুসলমান, না মুসলমান হয়ে বাঙালি?” পৃথিবীতে সকল শিশু ভূমিষ্ঠ হয় মুসলিম হয়ে, এরপর সে তার বংশ, গোত্র, জাতি, জাতীয়তা লাভ করে যেদেশে সে জন্মলাভ করেছে তার উপর।

(খ). এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের মুসলমানদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক দিকনির্দেশ।

(গ). ইসলাম আমাদের সত্তা, বাঙালিত্ব আমাদের রূপ; যদি সত্তা মরে যায়, রূপ অর্থহীন হয়ে পড়ে; আর যদি রূপ মুছে যায়, সত্তা একা টিকতে পারে না।

(ঘ). ইসলামী সত্তা এবং বাঙালিত্ব রূপের অপূর্ব সমন্বয়: “হে মানুষ, আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যক্তিই বেশী মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশী তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত (সূরা হুজুরাত, ৪৯:১৩)”। (মোস্তফা: ০৩-০১-২৬)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category