মাদক কারবারীদের হামলায় আহত কলেজ শিক্ষকের মৃত্যু
বিক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী আসামীদের বাড়ী ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
লালমনিরহাট জেলা পতিনিধি
রওশন বাবু
০১৭২৫১৯২৪২৪
মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় মাদক কারবারীদের হামলায় আহত লালমনিরহাট সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মারা গেছেন। শুক্রবার রাতে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। গত ১ আগষ্ট তিনি হামলার শিকার হয়েছিলেন। কলেজ শিক্ষকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী আসামীদের বাড়ী-ঘর ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভান। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন আদিতমারী থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) নাজমুস সাকিব সজীব।
ওসি জানান,’ কলেজ শিক্ষকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেন। পুলিশ খবর পেয়ে তাৎক্ষনিব ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। বিক্ষুদ্ধ এলাকাবাসীকে শান্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হয়।’
নিহত কলেজ শিক্ষক হলেন আরিফুল ইসলাম (৩৫)। তিনি আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে।
পুলিশ জানায়, মাদক, জুয়া, বাল্যবিয়েসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ প্রতিরোধে ‘আলোকিত লালমনিরহাট’ নামে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। এ আন্দোলনের কমিটিতে শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন। আরিফুল ইসলাম তার গ্রামের মাদক ও অনলাইন জুয়া চক্রকে এসব কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তারা সরে না এলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিষয়টি জানানোর কথা বলেন।
এর জেরে গত ১ আগস্ট কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে আগে থেকে ওত পেতে থাকা রহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে কয়েকজন তার ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আরিফুলের মাথায় কুপিয়ে গুরুতর জখম করে।
পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। শুক্রবার রাতে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় আরিফুলের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বাদী হয়ে ২ আগস্ট রহিদুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের বিরুদ্ধে আদিতমারী থানায় মামলা করেন। মামলায় আটজন আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হলেও প্রধান আসামি রহিদুল পলাতক ছিলেন। পরে গত ১২ আগস্ট রাতে রাজধানীর হাতিরঝিল নয়াটোলা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে রংপুর র্যা ব-১৩ এর সদস্যরা।
নিহত কলেজ শিক্ষক আরিফুলের বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘আমার ছেলে একটি সুস্থ সুন্দর ও সামাজিক অপরাধমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলো। কিন্তু দুষিত সমাজের কিছু দুষিত মানুষ আমার ছেলের জীবন কেড়ে নিলো।’
তিনি বলেন, গত ৬ আগস্ট আরিফুলের স্ত্রী ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছে কিন্তু আরিফুল তার ছেলের মুখ দেখে যেতে পারলো না। ‘আমকার ছেলের ওপর হামলাকারীরা গ্রামে দুর্বৃত্ত, দুশ্চরিত্র ও লুণ্ঠন প্রকৃতির লোক। তারা সকলে সিন্ডিকেট করে গ্রামে নানা ধরনের অপকর্ম সংঘটিত করেন। তাদের সর্বোচ্চ শাfস্তির দাবি করছি,’ তিনি বলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, আরিফুলের মৃত্যুর খবর শোনার পর এলাকাবাসী বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেন। তারা হামলাবারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। এসময় বিক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী আসামীর তিনটি বাড়ী ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে আসার আগেই বাড়ী-ঘর ও আসবাবপত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের টিম এসে আগুন নেভায়। ‘আরিফুল সৎ মানুষ ছিলেন। তিনি আমাদের গ্রামের মঙ্গল চেয়েছিলেন। আমাদের গ্রামে ছড়িয়েপড়া মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন তিনি,’ তিনি বলেন।
স্থানীয় বাসিন্দা সেকেন্দার আলী অভিযোগ করেন, তাদের গ্রামে সম্প্রতি মাদক ও অনলাইন জুয়া বেড়ে গেছে। এ কারনে এলাকায় চুরি ও ছিনতাই বেড়ে গেছে। সুস্থভাবে সমাজে বসবাস করার পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। মাদক ও অনলাইন জুয়ার সাথে জড়িতরা দুষ্ট প্রকৃতির এবং তারা সকলে সংঘবদ্ধ। এ কারনে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাও যায় না। ‘কলেজ শিক্ষক আরিফুলের মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। আমাদের গ্রামের পথপ্রদর্শক এক মহৎ জীবনকে আমরা হারালাম,’ তিনি বলেন।
আদিতমারী ওসি নাজমুস সাকিব সজীব বলেন, ’কলেজ শিক্ষক আরিফুলের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি এখন হত্যা মামলা হিসেবে রেকর্ড করা হবে। ঘটনার সাথে জড়িত আসামীদের গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান চলছে।