আজাদ ( মণি সিংহ)
ব্রিটিশ শাসক ও পাকিস্তানি সামরিক শাসনের আতঙ্ক, কৃষক-শ্রমিকের অবিসংবাদিত নেতা।
মোঃ আরিফুল ইসলাম মুরাদ সিনিয়র সাংবাদিক সটাফ রিপোটার,,,
মণি সিংহ ছিলেন এদেশের গণমানুষের রাজনীতির এক অনন্য নাম। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, ছিলেন কৃষক-শ্রমিকের মুক্তির স্বপ্নে বিভোর এক আজীবন সংগ্রামী বিপ্লবী।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, পাকিস্তানি সামরিক শাসন এবং শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম তাঁকে পরিণত করেছিল কিংবদন্তিতে। জনসাধারণের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন শুধু “মণি সিংহ” নামে, আর বিপ্লবী আন্দোলনের গোপন অধ্যায়ে তিনি পরিচিত ছিলেন “আজাদ” ছদ্মনামে।
১৯০১ সালের ২৮ জুলাই, তৎকালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার সুসং দুর্গাপুর অঞ্চলের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা কালী কুমার সিংহ এবং মাতা সরলা দেবী। শৈশবেই পিতৃহারা হন তিনি। এরপর মা সরলা দেবী ভাইদের জমিদারির অংশীদার হয়ে সন্তানকে নিয়ে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যান। সেই পারিবারিক বাস্তবতা এবং চারপাশের কৃষক-জনতার দুঃখ-কষ্ট ছোটবেলাতেই মণি সিংহের মনে গভীর মানবিক বোধ তৈরি করে।
স্কুলজীবনেই তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। বিপ্লবী সংগঠন ‘অনুশীলন’-এ যোগ দিয়ে তরুণ মণি সিংহ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক চেতনার নতুন জগতে প্রবেশ করেন। কিন্তু ১৯২১ সালের অসহযোগ আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলনের গণজাগরণ তাঁর রাজনৈতিক ভাবনাকে নতুন মোড় দেয়। মহাত্মা গান্ধীর আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন—জনগণকে সঙ্গে নিয়েই প্রকৃত মুক্তির পথ নির্মিত হতে পারে।
রুশ বিপ্লবের আদর্শ তাঁর চিন্তাজগতে গভীর আলোড়ন তোলে। ১৯২৫ সালে প্রখ্যাত বিপ্লবী গোপেন চক্রবর্তীর সঙ্গে আলোচনার পর তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। এরপর তিনি কলকাতায় চলে যান এবং মেটিয়াবুরুজ অঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করতে শুরু করেন। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তাঁর দৃঢ় ভূমিকার কারণে ১৯৩০ সালের ৯ মে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ পাঁচ বছর কারাভোগের পর মুক্তি পেলেও তাঁকে নিজ এলাকা সুসং দুর্গাপুরে অন্তরীণ রাখা হয়।
কিন্তু কারাবাস কিংবা দমননীতি কোনো কিছুই তাঁকে থামাতে পারেনি। কৃষকের ন্যায্য অধিকার আদায়ে তিনি ক্রমেই হয়ে ওঠেন আপসহীন কণ্ঠস্বর। পাটের ন্যায্য মূল্য দাবি করে কৃষকদের পক্ষে বক্তৃতা দেওয়ায় আবারও তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। এ সময় তাঁর নিজ মামাদের জমিদার পরিবারের সঙ্গেও বিরোধ তৈরি হয়। তবু তিনি কৃষক-ক্ষেতমজুরদের পক্ষ ত্যাগ করেননি।
১৯৩৭ সালে জেল থেকে বেরিয়ে তিনি যখন আবার কলকাতায় ফিরে যেতে চান, তখন সুসং অঞ্চলের মুসলমান কৃষক, গারো ও হাজং আদিবাসীরা তাঁকে অনুরোধ করেন “টংক প্রথা”র বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে মণি সিংহ আত্মনিয়োগ করেন কৃষক আন্দোলনে। ধীরে ধীরে তিনি টংক আন্দোলনের প্রাণপুরুষে পরিণত হন। তাঁর নেতৃত্বে নিপীড়িত কৃষকসমাজ শোষণের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে শুরু করে।
১৯৩৮ সালে তিনি ময়মনসিংহ জেলায় কমিউনিস্ট পার্টির সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কৃষক আন্দোলনের সেই ধারাবাহিকতা পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালের ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন এবং ১৯৪৮ সালের নাচোল বিদ্রোহের পথ প্রস্তুত করে।
ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে যেমন তিনি ছিলেন আপসহীন, তেমনি পাকিস্তান আমলেও শোষণ ও সামরিক দমননীতির বিরুদ্ধে ছিলেন অটল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর কমিউনিস্ট পার্টির ওপর দমননীতি শুরু হলে তাঁকে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকতে হয়। তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়; এমনকি আইয়ুব সরকার তাঁকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল। কিন্তু এসব ভয়-ভীতি তাঁর সংগ্রামী মনোবলকে টলাতে পারেনি।
১৯৫১ সালে আত্মগোপন অবস্থায় তিনি পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরপর বহু বছর তিনি গোপনে সংগঠন পরিচালনা করেন। পাকিস্তান আমলের অধিকাংশ সময়ই তাঁকে আত্মগোপন, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মধ্যে কাটাতে হয়েছে।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি মুক্তি পান। কিন্তু আবারও সামরিক সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি রাজশাহী জেলে বন্দী ছিলেন। পরে বন্দীরা জেল ভেঙে তাঁকে মুক্ত করেন এবং তিনি ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ছিলেন মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মওলানা ভাসানী ও মোজাফফর আহমদ প্রমুখ। ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনী গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের সমর্থন আদায়েও তিনি অনন্য অবদান রাখেন।
স্বাধীনতার পরও তিনি থেমে থাকেননি। শোষণমুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি আজীবন সক্রিয় ছিলেন।
১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর আবারও কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হলে তাঁকে নতুন করে দমন-পীড়নের মুখোমুখি হতে হয়। ৭৭ বছর বয়সেও তাঁকে কারাগারে যেতে হয়েছে।
তবু তিনি অবিচল ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পার্টির দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বর এই মহান বিপ্লবীর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর সংগ্রাম, ত্যাগ ও আদর্শ আজও গণমানুষের প্রেরণা হয়ে আছে।
প্রতি বছর নেত্রকোণার দুর্গাপুরে টংক স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে তাঁর স্মরণে “কমরেড মণি মেলা” অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এখনো কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, গণতন্ত্র ও শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
মণি সিংহ ছিলেন এমন এক মানুষ, যিনি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করেননি; রাজনীতি করেছিলেন মানুষের মুক্তির জন্য। জেল, নির্যাতন, আত্মগোপন কিংবা মৃত্যুভয়—কিছুই তাঁকে আদর্শচ্যুত করতে পারেনি। তাই ইতিহাসে তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং বাংলার মাটি ও মানুষের মুক্তির সংগ্রামের এক অমর প্রতীক।