ফয়সল হোসেন চৌধুরী – স্কটল্যান্ডের প্রথম ব্রিটিশ-বাংলাদেশি এমএসপি হিসেবে ইতিহাস গড়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর সংসদীয় মেয়াদের সমাপ্তি ঘিরে স্কটল্যান্ডের বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে প্রতিনিধিত্ব, জনসেবা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে আশাবাদ ও আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
২০২১ সালে লোথিয়ান অঞ্চলের সদস্য হিসেবে স্কটিশ পার্লামেন্টে নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তিনি শুধু রাজনৈতিক সফলতাই অর্জন করেননি, বরং বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তি এবং বহুসাংস্কৃতিক সমাজের প্রতীক হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সমগ্র যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রথম ও একমাত্র পুরুষ পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে তাঁর এই অর্জন অনুপ্রতিনিধিত্বশীল কমিউনিটিগুলোর জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার বদরদী গ্রামে জন্মগ্রহণকারী ফয়ছল চৌধুরী ছোটবেলা থেকেই স্কটল্যান্ডে বেড়ে ওঠেন। রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগে তিনি দীর্ঘদিন তৃণমূল পর্যায়ে কমিউনিটি উন্নয়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি এবং নাগরিক নেতৃত্ব নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সক্রিয় সম্পৃক্ততা তাঁকে জনসেবার এক সুপরিচিত ও গ্রহণযোগ্য মুখে পরিণত করে।
সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি ব্রিটিশ রাণীর কাছ থেকে এমবিই (Member of the Order of the British Empire) সম্মাননায় ভূষিত হন। এটি তাঁর দীর্ঘদিনের মানবিক ও সামাজিক কাজের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্কটিশ পার্লামেন্টে তিনি সংস্কৃতি, সমতা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং কমিউনিটি ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি স্কটিশ লেবারের সংস্কৃতি, ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক Shadow Minister এবং Deputy Party Spokesperson হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি একাধিক সংসদীয় কমিটিতে যুক্ত থেকে আইন পর্যালোচনা, জননীতি মূল্যায়ন এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ বিষয়ক, বর্ণ ও ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রতিরোধ, সংস্কৃতি ও কমিউনিটিজসহ বিভিন্ন Cross Party Group-এর কনভেনার ও কো-কনভেনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিবাসন, স্বাস্থ্য উন্নয়ন, স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম এবং ফিলিস্তিন ইস্যুসহ বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
ফয়ছল চৌধুরী স্কটল্যান্ড ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থীসহ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সহায়তায় মানবিক উদ্যোগকে সমর্থন করে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রশংসা অর্জন করেন।
নিজের সংসদীয় যাত্রা নিয়ে প্রতিফলন করতে গিয়ে তিনি বলেন—
“স্কটিশ পার্লামেন্টে জনগণের সেবা করার সুযোগ পাওয়া আমার জীবনের অন্যতম বড় সম্মান। আমি সবসময় চেয়েছি আরও বেশি তরুণ এবং অনুপ্রতিনিধিত্বশীল পটভূমির মানুষ রাজনীতি ও জনসেবায় এগিয়ে আসুক। আমি আশা করি, ভবিষ্যতে আরও অনেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তি স্কটিশ পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করবেন।”
তিনি আরও বলেন—
“জনসেবার একটি মেয়াদ থাকতে পারে, কিন্তু কমিউনিটি সেবা আজীবনের। মানুষের জীবন পরিবর্তনের কাজ কখনো থেমে থাকে না।”
ফয়সল চৌধুরীর জীবন ও কর্ম আজও স্কটল্যান্ডজুড়ে বহু মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। তাঁর সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রমাণ করে—দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, সততা ও কমিউনিটির প্রতি ভালোবাসা থাকলে সমাজে ইতিবাচক ও স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব।