বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে সম্প্রতি একটি যুগের অবসান ঘটেছে এবং জাতি হারিয়েছে তার প্রকৃত রাজনৈতিক অভিভাবককে। একই সঙ্গে তাঁর অনুপস্থিতিতে বিএনপিকে সঠিক পথে নেতৃত্ব দেওয়া এবং তাঁর সত্যিকারের রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার বড় চ্যালেঞ্জ এসে পড়েছে তারেক রহমানের সামনে। যদিও এই পৃথিবীতে কিছুই স্থায়ী নয়, তবুও কিছু জীবন ও সময় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে চিরকাল থেকে যায়। বাংলাদেশ যতদিন টিকে থাকবে, ততদিন বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ও সময় আমাদের জাতীয় ইতিহাসের পাতায় সোনালি অক্ষরে লেখা থাকবে। ইতিহাস সবসময় জাতি ও বাংলাদেশের মানুষের জন্য তাঁর অসামান্য অবদান স্মরণ করবে। তিনি চিরকাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কিংবদন্তিতুল্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণীয় থাকবেন।
বেগম খালেদা জিয়ার উত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। একজন গৃহিণীর অবস্থান থেকে তিনি একজন সফল রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন এবং দক্ষিণ এশিয়ার সমকালীন ইতিহাসের এক আকর্ষণীয় অধ্যায় হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশ হারিয়েছে এমন এক মহান রাজনৈতিক নেত্রীকে, যিনি চার দশক ধরে নিজেকে জাতির প্রকৃত অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং দেশপ্রেমের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। তিনি নিজেকে দেশের নেত্রী ও গণতন্ত্রের জননী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থে আপসহীন অবস্থানের জন্যও তিনি সমানভাবে খ্যাত ছিলেন। কোনো রাজনৈতিক পটভূমি ছাড়াই তিনি রাজনীতিতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এবং বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে বিরল ভালোবাসা ও সম্মান লাভ করেছেন। তাঁর জীবন ও সময় প্রমাণ করে যে সাহস ও অঙ্গীকারই সমাজে প্রকৃত নেতৃত্বের জন্ম দেয়, আর তাঁর পথচলা আগামী প্রজন্ম ও নিকট ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রাজনীতিকে পথ দেখাবে।
৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অনুষ্ঠিত তাঁর নামাজে জানাজা পূর্ববর্তী সব জামাতের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। পাকিস্তান পার্লামেন্টের স্পিকার সর্দার আয়াজ সাদিক, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মা, শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি. এন. ধুঙ্গেলসহ বহু বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তি ঢাকায় এসে তাঁর বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এটি দেশ-বিদেশে তাঁর সফল রাষ্ট্রনায়কত্ব ও জনপ্রিয়তার প্রমাণ বহন করে। জনসমাবেশটি মানুষের এক বিশাল স্রোতে পরিণত হয়, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।
তিনি বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবাসতেন এবং গণতন্ত্র ও দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর দেশপ্রেম ছিল প্রশ্নাতীত; তিনি আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কখনো আপস করেননি। তিনি একসময় সামরিক শাসকের অধীনে রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করলেও আশির দশকের শেষদিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান নেত্রীতে পরিণত হন।
তাঁর দক্ষ নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। দলের প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর বিএনপিকে নিশ্চিত বিলুপ্তির হাত থেকে তিনি শুধু রক্ষা করেননি, বরং এটিকে একটি বাস্তব রাজনৈতিক দল ও বাংলাদেশের একমাত্র জাতীয়তাবাদী শক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করেছেন। তিনি বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রকৃত অভিভাবক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
ইসলাম, ইসলামী সংস্কৃতি ও রাজনীতি তাঁর ও তাঁর সরকারের কাছ থেকে যথেষ্ট সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। তিনি দেশের আলেম ও উলামাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। প্রায়ই তিনি বলতেন, বাংলাদেশ হাফেজ ও ইসলামী পণ্ডিতসমৃদ্ধ একটি গর্বের দেশ। ইসলামী রাজনীতি সরকারের কোনো বাধা ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করার উৎসাহ ও আত্মবিশ্বাস পেয়েছিল।
তাঁর দল ক্ষমতায় থাকাকালে জাতি নিরাপদ ও শান্তি অনুভব করেছিল। তিনি আওয়ামী লীগের শক্ত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে দৃঢ় ভূমিকা পালন করেন। বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে সংসদে তিনি কখনো অশালীন শব্দ বা ব্যঙ্গাত্মক ভাষা ব্যবহার করেননি। মার্জিত ও শালীন ভাষার জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন।
রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তিনি সংগ্রামের পথে হাঁটেন এবং জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর সারা জীবন নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন। তবুও সমাজে গণতান্ত্রিক চর্চা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি কখনো তাঁর মিশন ত্যাগ করেননি। এরশাদের সামরিক শাসনামলে তিনি গণতন্ত্রের চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানে তাঁর সাহসী ভূমিকা তাঁকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেত্রীতে পরিণত করে। মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম তাঁকে “গণতন্ত্রের জননী” উপাধিতে ভূষিত করে। জাতীয় স্বার্থে তিনি ছিলেন কঠোর ও আপসহীন—এ গুণই তাঁকে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেত্রীতে পরিণত করে। এটি সহজ ছিল না; বরং বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে অর্জিত কঠোর পরিশ্রমের ফল। তিনি দেশের জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী শক্তির প্রেরণা ও অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত হন।
সংসদীয় শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা জেনেও তিনি দেশে তা পুনঃপ্রবর্তনের বড় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি ও বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা ছিল তাঁর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দিক। নারী শিক্ষায় পৃষ্ঠপোষকতাও তাঁর সরকারের কম গুরুত্বপূর্ণ অবদান নয়। তাঁর সময়ে তৈরি পোশাক (RMG) ও প্রবাসী আয় খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটে। তিনি গঙ্গা নদীর পানিবণ্টনের বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করেন এবং ন্যায্য পানির হিস্যা নিশ্চিত করেন।
তিনি ভারতের সঙ্গে যেমন ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গেও। ১৯৯১–১৯৯৬ মেয়াদে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব পায়। তবে তৃতীয় মেয়াদে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নানা জটিলতার মুখে পড়েন এবং তাঁর সরকার আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির কূটনৈতিক চাপে পড়ে।
তবে সবচেয়ে কঠিন আঘাত আসে মইনউদ্দিন–ফখরুদ্দিন সরকারের সময়, যখন তাঁকে ও তাঁর দুই পুত্রকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে উৎখাতের চেষ্টা করা হয়। তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করে সাব-জেলে রাখা হয়। দেশত্যাগের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। দেশ ও দেশের মানুষই ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। তিনি বাংলাদেশের মানুষের একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য নেত্রীতে পরিণত হন। ব্যক্তিগত সততা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেন এবং শান্তিপ্রিয় মানুষকে অনুপ্রাণিত করেন।
অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত শক্তির সম্মিলিত প্রয়াসে ২০০৮ সালের শেষদিকে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসেন। এর ফলে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনের অধীনে একটি অন্ধকার সময় শুরু হয় এবং বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর দল বিএনপি সরকারের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। তাঁকে শুধু এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়নি, বরং বাংলাদেশের বৃহৎ কেন্দ্রীয় কারাগারে নিঃসঙ্গভাবে বন্দি থাকতে হয়। তবুও কিছুই তাঁকে স্বৈরশাসনের কাছে নতি স্বীকার করাতে পারেনি। তাঁকে দেশের বাইরে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়া হয়নি; তিনি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। এটি শুধু নেতৃত্বের সংকট নয়; অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞারও শূন্যতা। বলা যায়, অদম্য সাহস ও রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রতীক হিসেবে তাঁর নাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ থাকবে।
খালেদা জিয়া-পরবর্তী সময়ের রাজনীতি নিয়ে পুরো জাতি উদ্বিগ্ন। তাঁর মা যেভাবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শ অনুসরণ করে জাতিকে পথ দেখিয়েছিলেন, সেভাবে তারেক রহমান কি সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারবেন? বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তারেক রহমানের জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা; তাঁকে বাংলাদেশের দুই মহান নেতার প্রকৃত উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের আগে মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল, তা আর আগের মতো নেই।
এখন পুরো জাতি স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রকৃত চেতনায় উদ্দীপ্ত; এর কম কিছুই ভবিষ্যতে তাদের সন্তুষ্ট করতে পারবে না। জাতির সেবায় এটি মনে রাখতে হবে; নচেৎ ভুল পথে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে এবং মানুষ ও দেশ এমন দুর্ভোগের মুখে পড়তে পারে, যা আগে কখনো দেখেনি। এখন প্রতিটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ এবং তা নিতে হবে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও পরিপক্বতার সঙ্গে। বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতেও বিএনপি ও তার শীর্ষ নেতৃত্বের রাজনীতির প্রতি জাতির অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে।
নির্বাচনের সময় বাংলাদেশের রাজনীতি অতীতের তুলনায় আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ভবিষ্যতের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর—বিশেষ করে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির—আন্তরিক সহযোগিতা ও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা প্রয়োজন। বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব রাজনীতিতে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহযোগিতার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছেন—এটি একটি ভালো লক্ষণ। খালেদা জিয়ার ইন্তেকালের পর যে জাতীয় ঐক্যের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, খালেদা জিয়া-পরবর্তী সময়ে তার সুস্থ বিকাশই পুরো জাতির প্রত্যাশা। দেশের শীর্ষ নেতাদের অবশ্যই বেগম খালেদা জিয়ার প্রদর্শিত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও পরিপক্বতা অনুসরণ করতে হবে।
**০৩/০১/২০২৬**