বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৩৬ পূর্বাহ্ন
Headline :
রংপুর সদরে আদালতের রায় অমান্য করে মসজিদের জমিতে ঘর নির্মাণের অভিযোগ ঐতিহ্যবাহী ফেকামারা কামিল মাদ্রাসা অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ–২০২৬: গাইবান্ধায় শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান নির্বাচিত মো. নওয়াব আলী প্রধান দেবহাটায় এক যুবককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন : জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে নির্যাতিত যুবক : আইনী সহযোগিতার আশ্বাস পুলিশের বেগম খালেদা জিয়া রূহের মাগফিরাত কামনায় তুরাগে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল নাফ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ টেকনাফের জেলে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, ময়মনসিংহ এবং রিটার্নিং অফিসারগন, পরিদর্শন করেন চাঁপাই মৎস্যচাষী সমবায় সমিতির সভাপতি ওবাইদুল সম্পাদক-সোহেল টেকনাফে আনসার ব্যাটালিয়নের অভিযানে নুর কামাল গ্রুপের দুই ডাকাত আটক বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় বগুড়া গাবতলী মহিষাবান ইউনিয়ন দলীয় কার্যালয় দোয়াও মাহাফিল

ইসলামে দলীয়তা ও দলাদলি

Dr. M. G. Mostafa Musa / ১৩ Time View
Update : সোমবার, ৫ জানুয়ারী, ২০২৬

*ইসলামে দলীয়তা ও দলাদলি:*
*সূরা আল-আন‘আম (৬:১৫৯)-এর আলোকে কুরআনি, নৈতিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ*

*সারসংক্ষেপ:* সূরা আল-আন‘আমের ১৫৯ নম্বর আয়াত কুরআনে ধর্মীয় বিভক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী বক্তব্যগুলোর একটি। এই আয়াত একদিকে দ্বীনকে দলে দলে বিভক্ত করার নিন্দা করে, অন্যদিকে নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-কে এ ধরনের বিভাজনের দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণভাবে অব্যাহতি দেয়। এই প্রবন্ধে আয়াতটি কুরআনের তাফসির, হাদীস, ইসলামী আইনতত্ত্ব, নৈতিক দর্শন এবং সমসাময়িক মুসলিম সমাজের দলাদলির বাস্তবতার আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রবন্ধটির মূল যুক্তি হলো, কুরআনের আপত্তি বৈধ মতভেদ (ইখতিলাফ)-এর বিরুদ্ধে নয়; বরং ধর্মকে দলীয় এবং দলাদলির আনুগত্যে রূপান্তর করার বিরুদ্ধে, যা আল্লাহর একত্ব, নৈতিক দায়বদ্ধতা ও দ্বীনের মৌলিক উদ্দেশ্যকে আড়াল করে দেয়। মূল শব্দ: দলাদলি, সূরা ৬:১৫৯, উম্মাহ, ইখতিলাফ, ইসলামী নৈতিকতা, সুন্নাহ

*১. ভূমিকা:* ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় দলাদলি দেখা গেছে কখনো আকিদাগত, কখনো ফিকহি, কখনো রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপে। যদিও ব্যাখ্যাগত বৈচিত্র্য অনিবার্য, কুরআন স্পষ্টভাবে বৈধ মতভেদ এবং ধ্বংসাত্মক বিভাজনের মধ্যে পার্থক্য টেনে দেয়। সূরা আল-আন‘আম (৬:১৫৯) এই পার্থক্য বোঝার জন্য একটি মৌলিক পাঠ্য। এই আয়াত সরাসরি দ্বীনের বিভাজন প্রসঙ্গে কথা বলে এবং ইসলামে দলীয় পরিচয়ের মূল্যায়নের একটি নীতিগত কাঠামো প্রদান করে।

*২. আয়াতের মূল পাঠ ও অনুবাদ:*
*إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَّسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ ۚ إِنَّمَا أَمْرُهُمْ إِلَى اللَّهِ ۚ ثُمَّ يُنَبِّئُهُم بِمَا كَانُوا يَفْعَلُونَ*
অনুবাদ: “নিশ্চয়ই যারা তাদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে এবং দলে দলে পরিণত হয়েছে, তাদের সঙ্গে (হে মুহাম্মদ-ﷺ) তোমার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয় আল্লাহর কাছেই; অতঃপর তিনি তাদের জানিয়ে দেবেন তারা কী করত।” (৬:১৫৯)

*৩. দ্বীন বিভাজন বনাম বৈধ মতভেদ:* “ফাররাকূ দীনাহুম” (তারা তাদের দ্বীনকে বিভক্ত করেছে) বাক্যাংশটি ফিকহি মতভেদের প্রতি ইঙ্গিত করে না; বরং দ্বীনের মৌলিক ঐক্য ভেঙে ফেলার দিকে নির্দেশ করে। ইবন কাসীর ও কুরতুবির মতো ক্লাসিক তাফসিরকারগণ ব্যাখ্যা করেছেন—এই নিন্দা প্রযোজ্য হয় তখন, যখন: দ্বীন দলীয় পরিচয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়; সত্যের চেয়ে গোষ্ঠীগত আনুগত্য প্রাধান্য পায়; মতভেদ পারস্পরিক বর্জন ও শ্রেষ্ঠত্বের দাবিতে রূপ নেয়। কুরআন একদিকে বৈচিত্র্যকে স্বীকার করে (১১:১১৮), অন্যদিকে অহংকার, ক্ষমতা ও পরিচয়ভিত্তিক দলাদলিকে কঠোরভাবে নিন্দা করে (৩০:৩২; ২৩:৫৩)।

*৪. সুন্নি ও শিয়া পরিচয়:*

কুরআনি দৃষ্টিকোণ: কুরআন “ ‘শিয়া বা সুন্নি’, এই পরিচয়গুলোকে ধর্মীয় মানদণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। বরং কুরআন একমাত্র বৈধ পরিচয় হিসেবে “মুসলিম” নামটিই নির্ধারণ করেছে (২২:৭৮)।

কুরআনের আলোকে: শিয়া ও সুন্নি পরিচয় ঐতিহাসিক নির্মাণ; দায়বদ্ধতা ব্যক্তিগত, সামষ্টিক নয়। মুক্তি নির্ভর করে ঈমান ও সৎ আমলের উপর, দলীয় পরিচয়ের উপর নয় (২:৬২); অতএব, এই আয়াত ইতিহাসের বৈচিত্র্য অস্বীকার করে না; বরং সেগুলোর ধর্মীয় চূড়ান্তকরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

*৫. ফিকহি মাজহাব ও মতভেদের নৈতিকতা:*

চারটি সুন্নি মাজহাব: হানাফি, মালিকি, শাফি ও হাম্বলি আকিদাগত দল নয়; বরং আমলগত পদ্ধতির স্কুল। তাঁদের ইমামগণ নিজেরাই অন্ধ অনুসরণের বিরোধিতা করেছেন। ইমাম আবু হানিফা (রাহি.) বলেন: “যে ব্যক্তি আমাদের বক্তব্যের উৎস জানে না, তার জন্য আমাদের মত গ্রহণ করা বৈধ নয়।”

সমস্যা দেখা দেয় যখন মাজহাব পরিচয়ে পরিণত হয়; সাংস্কৃতিক রীতিকে শরিয়ত হিসেবে পবিত্র করা হয়; ফিকহি মতভেদকে নৈতিক মানদণ্ড বানানো হয়। এই প্রবণতাগুলো কুরআনের দলাদলি-বিরোধী সতর্কতার আওতায় পড়ে।

*৬. তোমার সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই: অর্থ ও হিকমাহ:*

“লাস্তা মিনহুম ফি শাইয়ীন: তোমার সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই” বাক্যটি তাকফীর নয় (অমুসলিম ঘোষণা নয়); বরং রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তাঁর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ওহী পৌঁছে দেওয়ার পর সৃষ্ট বিভাজনের দায় তাঁর উপর নয়।

এর পেছনের হিকমাহ: এই আয়াতের পেছনে যে হিকমাহ নিহিত রয়েছে, তা মূলত নবুয়তি দায়িত্ব ও মানবীয় প্রতিক্রিয়ার সীমারেখা নির্ধারণ। আল্লাহ তাআলা এখানে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, সত্য বার্তা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত; কিন্তু সেই বার্তা গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের ফলে সমাজে যে বিভাজন, দলাদলি বা মতভেদ সৃষ্টি হয়, তার নৈতিক দায়ভার তাঁর নয়। এর মাধ্যমে নবীকে কোনোভাবেই বিভাজনের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি, বরং তাঁকে সেই দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

এই আয়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ হিকমাহ হলো ধর্মীয় নেতৃত্বকে অতিমানবীয় বা কর্তৃত্ববাদী রূপ দেওয়া থেকে বিরত রাখা। যাতে কোনো নবী, আলেম বা দাঈ নিজেকে মানুষের ঈমানের চূড়ান্ত বিচারক মনে না করেন। একই সঙ্গে এটি এমন সব ধর্মতাত্ত্বিক প্রবণতাকে ভেঙে দেয়, যেখানে মতভিন্নতার জবাবে জোরপূর্বক মত চাপানো, দলগত শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করা বা ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর ঈশ্বরত্বের প্রতিনিধি সেজে হুকুম চালানোর প্রবণতা দেখা যায়।

এ আয়াত আরও স্পষ্ট করে যে, চূড়ান্ত বিচার, হিসাব ও পরিণতির একচ্ছত্র অধিকার কেবল আল্লাহর হাতে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর কাজ দাওয়াহ ও বালাগ—বিচার বা তাকফীর নয়। ফলে এটি কোনো আপেক্ষিক ধর্মতত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করে না; বরং সত্যকে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করার পর মানবিক স্বাধীনতা ও আল্লাহর ন্যায়বিচারের ভারসাম্য বজায় রাখে।

“এই দৃষ্টিকোণ থেকে আয়াতটি একদিকে যেমন জোরপূর্বক মতবাদ চাপানোর ধর্মতত্ত্বকে নাকচ করে, তেমনি অন্যদিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সত্যের অস্তিত্ব ও দ্বীনের সার্বজনীনতাকে পূর্ণভাবে স্বীকার করে।”

*৭. সহায়ক কুরআন ও হাদীসের প্রমাণ:*

কুরআন: “আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধরো এবং বিভক্ত হয়ো না (৩:১০৩)”।

কুরআন: “প্রত্যেক দল নিজের কাছে যা আছে তা নিয়েই আনন্দিত (৩০:৩২)”।

হাদীস: রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেন:
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু সংযোজন করে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত”। (বুখারি: ২৬৯৭; মুসলিম: ১৭১৮)।

এতে একটি মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়: মূলনীতি বিকৃতকারী নতুনত্ব বাতিল; পদ্ধতিগত বৈচিত্র্য গ্রহণযোগ্য।

*৮. আইন, নৈতিকতা ও দর্শনের আলোকে বিশ্লেষণ:*

_৮.১ আইন (শরিয়াহ)–এর দৃষ্টিতে:_ ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বিচার ও জবাবদিহি সম্পূর্ণরূপে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, হোক তা সংখ্যাগরিষ্ঠ বা ঐতিহ্যগতভাবে প্রভাবশালী, জান্নাত বা নাজাতের চূড়ান্ত ফয়সালার মালিক নয়। কুরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, আল্লাহ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজ কর্ম, নিয়ত ও জ্ঞানের আলোকে বিচার করবেন। সুতরাং কোনো দল, মাযহাব বা মতাদর্শ নিজেকে “একমাত্র নাজাতপ্রাপ্ত গোষ্ঠী” দাবি করলে তা শরিয়াহর ন্যায়বিচারের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।

_৮.২ নৈতিকতার দৃষ্টিতে:_ নৈতিকতার বিচারে সত্য কখনোই অন্ধ দলীয় আনুগত্যের অধীন হতে পারে না। সত্যের প্রতি আনুগত্য মানে হলো, নিজের অবস্থান যাচাই করার নৈতিক সাহস রাখা এবং মতভেদে বিনয় ও সহনশীলতা প্রদর্শন করা। ইসলামী নৈতিকতা মানুষকে শেখায়, “আমার ভুল হতে পারি”—এই স্বীকারোক্তি অধিক নৈতিক। অতএব, মতভিন্ন ব্যক্তিকে অবমূল্যায়ন বা নৈতিকভাবে হেয় করা ইসলামী নৈতিকতার পরিপন্থী।

_৮.৩ দর্শনের দৃষ্টিতে:_ দর্শনগতভাবে দেখা যায়, ধর্ম যখন একটি স্থির পরিচয় (identity)–এ পরিণত হয়, যেমন আমি অমুক দলের, অমুক মতের তখন ধর্ম তার অতীন্দ্রিয় ও নৈতিক গভীরতা হারাতে শুরু করে এবং ক্ষমতা ও সীমারেখার প্রতীকে রূপ নেয়। কিন্তু ধর্ম যখন একটি চলমান পথ (path) হিসেবে অনুধাবিত হয়, যা মানুষকে আত্মসমালোচনা, নৈতিক উন্নয়ন ও আল্লাহর নিকটবর্তী করে, তখন তা মানুষের ভেতরে সত্যিকারের নৈতিক সচেতনতা জাগ্রত করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ইসলাম কোনো বন্ধ পরিচয় নয়; বরং এটি সত্যের দিকে এগিয়ে চলার এক অবিরাম নৈতিক যাত্রা।

*৯. উপসংহার:* সূরা আল-আন‘আম (৬:১৫৯) ধর্মীয় দলাদলির বিরুদ্ধে একটি গভীর কুরআনি সমালোচনা। এটি না বৈচিত্র্য অস্বীকার করে, না একরূপতা চাপিয়ে দেয়। বরং উৎস, উদ্দেশ্য ও নৈতিক দায়বদ্ধতায় ঐক্যের ডাক দেয় এবং ব্যাখ্যা ও চর্চায় যুক্তিসঙ্গত ভিন্নতা মেনে নেয়। এই আয়াত মুসলিমদের দলীয় মোহ থেকে সরিয়ে আন্তরিকতা, বিনয় ও আল্লাহর সামনে একমাত্র ‘মুসলিম’ পরিচয়ে জবাবদিহিতার দিকে ফিরিয়ে আনে।

_সারকথা:_ ইসলাম কোনো দল নয়, এটি একটি হিদায়েতের পথ, যে সব মানুষেরা এই পথে চলতে চায়, সেই ইসলামী পথ মানুষকে ‘মুসলিম’ হিসেবে আল্লাহর দিকে নিয়ে যায়।

*আল্লাহ-হুম্মা সাল্লি, ওয়া সাল্লিম, ওয়া বারিক আ’লা মুহাম্মাদ; আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন*। (মূসা: ০৫-০১-২৬)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category