বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৯:৩৭ পূর্বাহ্ন
Headline :
রংপুর সদরে আদালতের রায় অমান্য করে মসজিদের জমিতে ঘর নির্মাণের অভিযোগ ঐতিহ্যবাহী ফেকামারা কামিল মাদ্রাসা অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ–২০২৬: গাইবান্ধায় শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান নির্বাচিত মো. নওয়াব আলী প্রধান দেবহাটায় এক যুবককে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন : জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে নির্যাতিত যুবক : আইনী সহযোগিতার আশ্বাস পুলিশের বেগম খালেদা জিয়া রূহের মাগফিরাত কামনায় তুরাগে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল নাফ নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ টেকনাফের জেলে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, ময়মনসিংহ এবং রিটার্নিং অফিসারগন, পরিদর্শন করেন চাঁপাই মৎস্যচাষী সমবায় সমিতির সভাপতি ওবাইদুল সম্পাদক-সোহেল টেকনাফে আনসার ব্যাটালিয়নের অভিযানে নুর কামাল গ্রুপের দুই ডাকাত আটক বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় বগুড়া গাবতলী মহিষাবান ইউনিয়ন দলীয় কার্যালয় দোয়াও মাহাফিল

ইসলামী রাজনীতির পুনরুত্থান

প্রফেসর ড. এস. কে. আকরাম আলী / ১৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২৬

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। এটি ইহকাল ও পরকালে সফল জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করে। পবিত্র কুরআনে নির্ধারিত ইসলামী ব্যবস্থার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো রাজনীতি। কিন্তু আমরা মুসলমানরা এ সত্যটি ভুলে গেছি এবং পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতি অতিমাত্রায় আসক্ত হয়ে পড়েছি। ইরান ও আফগানিস্তানের মুসলমানরা আন্তরিকভাবে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পশ্চিমা শক্তিগুলো এ ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশের মানুষ ইসলামী শাসনব্যবস্থা চালু হওয়া দেখতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যমান অধিকাংশ রাজনৈতিক দল, যেগুলো পশ্চিমা গণতান্ত্রিক শক্তির পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত, তারা এর পক্ষে নয়।

সমগ্র ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে ইসলামী আন্দোলন দেখা গেলেও সেগুলো উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। ঢাকায় মুসলিম লীগের জন্ম ভারতীয় মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের বীজ রোপণ করে এবং সেখানে ইসলাম ছিল মূল কেন্দ্রবিন্দু। পাকিস্তানের জন্ম মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী শাসনের স্বপ্ন জাগালেও বিশৃঙ্খল রাজনীতি সেই আকাঙ্ক্ষাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়।

বাংলা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রাধান্য লাভ করে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম হয়। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির উত্থান বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অনুভূতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে পুরো মুসলিম সমাজকে প্রভাবিত করে। নবজাত রাষ্ট্রে বাঙালি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় ইসলাম ও ইসলামী সংস্কৃতি। বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখা হয়। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির তকমা লাগিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দলের কর্মীদের ওপর নিপীড়ন চালানো হয়।

শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশে ইসলাম তার সবচেয়ে কঠিন সময় অতিক্রম করে এবং সমাজ থেকে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ইসলামের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। অনেক চিন্তাবিদ একে সমাজ থেকে ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ নির্মূলের আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি ইসলামের জন্য এক অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট শেখ মুজিবের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এক আমূল রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়।

জিয়াউর রহমানের উত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দ্রুত পরিবর্তিত হয়। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা উৎসাহিত করেন এবং ইসলামী রাজনীতিকে সমাজে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দেন। ইসলামী শাসনের আন্দোলন সমাজে ধীরে ধীরে ভিত্তি মজবুত করতে থাকে। শুরু থেকেই জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। যদিও তারা বড় রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন করতে পারেনি, তবে সমাজের সব স্তরে নেতৃত্ব গড়ে তুলতে তারা অত্যন্ত সফল হয়।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ অন্যান্য দলও ইসলামী রাজনীতির অঙ্গনে সামনে আসে। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন উভয়েই সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এ আন্দোলনে আরও সক্রিয় ছিল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামে ইসলামী পার্টি, খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি ইসলামী রাজনৈতিক দল।

সামরিক শাসক এরশাদের শাসনামলে ইসলাম ও ইসলামী সংস্কৃতি ব্যাপক উৎসাহ লাভ করে। এটি বাংলাদেশে ইসলামী সংস্কৃতির পুনরুত্থানের একটি সময় ছিল। তিনি ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটান এবং ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। একে সমাজের ইসলামীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং ইতিহাসে তিনি সে জন্য একটি অবস্থান নিশ্চিত করেন।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে ইসলামী রাজনীতির রাজনৈতিক পুনরুত্থান স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়, যেখানে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। জামায়াতের নিঃশর্ত সমর্থনে খালেদা জিয়ার সরকার গঠিত হয়। ধীরে ধীরে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ দেশের একমাত্র শক্তিশালী ইসলামী রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। খালেদা জিয়ার প্রথম শাসনামলে ইসলামী রাজনীতি অনুকূল পরিবেশ লাভ করে।

২০০১–২০০৬ সময়কালে ইসলামী রাজনীতির প্রকৃত অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়, যখন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ সরকারে অংশগ্রহণ করে এবং জনগণের জন্য উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। অন্যান্য ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও সে সময় রাজনীতিতে অনুকূল পরিস্থিতি বিরাজ করে। জামায়াতের সাফল্য দেশি-বিদেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও প্রতিবেশী দেশের ঈর্ষার কারণ হয়ে ওঠে।

গত পনেরো বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনামলে ইসলামী রাজনীতি আবারও চরম সংকটের মুখে পড়ে। বাংলাদেশের প্রধান ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী অকল্পনীয় নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়। রাজনীতি থেকে চিরতরে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে তাদের শীর্ষ নেতাদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করা হয়। অন্যান্য ইসলামী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও এই অন্ধকার সময়ে চরম দুর্ভোগ পোহান।

২০২৪ সালের সাম্প্রতিক জুলাই বিপ্লব ইসলামী রাজনীতির জন্য এক আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, ইসলামী আন্দোলন ও হেফাজতে ইসলামসহ অধিকাংশ ইসলামী রাজনৈতিক দল ছাত্রনেতৃত্বাধীন এই বিপ্লবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং একে সফল করে তোলে। ইসলামী রাজনৈতিক নেতারা যদি প্রজ্ঞা ও পরিপক্বতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারতেন, তবে এটি একটি ইসলামী বিপ্লবে রূপ নিতে পারত।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসলামী রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ সুযোগকে ইসলামী বিপ্লবের পক্ষে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এখনও যে সুযোগগুলো অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য সুফল অর্জনের জন্য তারা আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে জামায়াতকে সক্রিয় ও সঠিক পথে অগ্রসর হতে দেখা যাচ্ছে।

ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ড জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। সমাজে ইসলামী আন্দোলনের যে জোয়ার ইতোমধ্যে দৃশ্যমান, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবিরোধী আন্দোলনের প্রতি ব্যাপক আবেগী সমর্থন। ওসমান হাদীর আন্দোলন আগামী দিনে আরও এগিয়ে যাবে—এর লক্ষণ স্পষ্ট। ইনকিলাব মঞ্চ তাদের প্রয়াত নেতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আরও সক্রিয় বলে মনে হচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নেতৃত্বাধীন ইসলামী ফ্রন্টের জন্য ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বীর বিক্রম-এর মতো একজন জাতীয় নেতাকে পাশে পাওয়া একটি বড় বিজয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কর্নেল অলি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং নিজেকে ইসলামের একজন মহান সৈনিক হিসেবে প্রমাণ করেছেন। বিপ্লবের দল এনসিপি (NCP) সাম্প্রতিককালে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ইসলামী ফ্রন্টে যোগ দিয়ে একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে নিকট ভবিষ্যতে দেশের ইসলামী রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা যায়।

বিশ্বাস করা হয়, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নেতৃত্বাধীন ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে যাচ্ছে। আগামী নির্বাচনে ইসলামী ফ্রন্টের বিজয় অস্বীকার করা যায় না। এমনকি তারা সরকার গঠন করতে না পারলেও পরবর্তী সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। এর মাধ্যমে অদূর ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর বিজয়ের দ্বার উন্মুক্ত হবে। দেশের মুসলিম জনগণ সেই দিনের অপেক্ষায় রয়েছে—ইনশাআল্লাহ।

**সম্পাদক, মিলিটারি হিস্ট্রি জার্নাল**
**৬ জানুয়ারি ২০২৬**


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category