অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক
গন মানুষের মননশীল শিক্ষাবিদ ও রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটি”-র আহ্বায়ক
হাকিকুল ইসলাম খোকন,বাপসনিউজঃ
বাংলাদেশের প্রজ্ঞাবান চিন্তাবিদদের মধ্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। তিনি কেবল একজন শিক্ষক নন, বরং প্রাবন্ধিক, গবেষক, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ও সমাজবিশ্লেষক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম মুরাদ আবিএননিউজকে জানিয়েছন।
১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার পাকুন্দিয়ায় তাঁর জন্ম। পিতা মুহাম্মদ আবদুল হাকিম এবং মাতা জাহানারা খাতুন। পারিবারিক পরিবেশ থেকেই তিনি জ্ঞানচর্চা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি আকৃষ্ট হন। ব্যক্তিজীবনে তাঁর সহধর্মিণী ফরিদা প্রধান। তাঁর দুই সন্তান—শুচিতা শরমিন ও ফয়সল আরেফিন দীপন।
উল্লেখযোগ্য যে, শুচিতা শরমিন একজন শিক্ষাবিদ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন; আর দীপন ছিলেন জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী, যিনি ২০১৫ সালে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন—যা দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে গভীর শোকের সৃষ্টি করে।
শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা, আনন্দমোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবনেই তিনি মুনির চৌধুরী, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ ও নীলিমা ইব্রাহিম-এর মতো প্রগতিশীল চিন্তাবিদদের সংস্পর্শে এসে তাঁর মনন আরও বিকশিত হয়।
পেশাগত জীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর বাংলা বিভাগে প্রায় চার দশক শিক্ষকতা করেছেন এবং বিভাগীয় সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। তাঁর শিক্ষাদান কেবল পাঠ্যসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি ছাত্রদের চিন্তা করতে শিখিয়েছেন, প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করেছেন।
চিন্তা ও কর্মে তিনি ছিলেন একাধারে মানবতাবাদী ও বাস্তববাদী। তিনি “রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষা কমিটি”-র আহ্বায়ক হিসেবে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তিনি মানুষের বিশ্বাস ও বাস্তবতার গুরুত্ব তুলে ধরতেন—কারণ তাঁর মতে, জনগণের অনুভূতিকে উপেক্ষা করে কোনো স্থায়ী পরিবর্তন সম্ভব নয়।
লেখালেখির ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ব্যাপক ও বহুমাত্রিক। রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি যুক্তিনির্ভর ও বিশ্লেষণধর্মী রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে মুক্তিসংগ্রাম, রাজনীতি ও দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তায় বাংলাদেশ, মানুষের স্বরূপ, স্বদেশচিন্তা প্রভৃতি। এছাড়া তিনি বার্ট্রান্ড রাসেল-এর গ্রন্থ অনুবাদসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদনা কাজেও যুক্ত ছিলেন।
তিনি ১৯৮২ সাল থেকে ‘লোকায়ত’ নামে একটি মননশীল পত্রিকা সম্পাদনা করে আসছেন, যা সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে গভীর চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাঁর চিন্তাধারায় নৈতিকতা, যুক্তিবাদ এবং মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।
তাঁর সাহিত্য ও গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া আলাওল সাহিত্য পুরস্কারসহ আরও নানা সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন—যা তাঁর দীর্ঘ সাধনার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
আবুল কাসেম ফজলুল হকের লেখায় সবসময় একটি বিষয় স্পষ্ট—মানুষের মুক্তি, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ এবং উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, চিন্তার জাগরণই পারে সমাজকে এগিয়ে নিতে।
তাঁর কলম তাই শুধু সাহিত্যচর্চার মাধ্যম নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।
সংক্ষেপে, তিনি এমন একজন মনীষী, যিনি জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিকতার আলো দিয়ে সমাজকে আলোকিত করার চেষ্টা করে গেছেন—এবং এখনো করে যাচ্ছেন।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.