
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
হাজার বছরের প্রজ্ঞা, ধর্মতত্ত্ব ও জ্ঞানচর্চার দীপ্ত উত্তরাধিকার বহনকারী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়—মুসলিম বিশ্বের এক অনন্য বৌদ্ধিক আলোকস্তম্ভ। কিন্তু গভীর উদ্বেগের বিষয়, এই মহিমান্বিত প্রতিষ্ঠানের নামকে পুঁজি করে একটি অসাধু গোষ্ঠী প্রতারণা, দালালি ও অপরাধের এক বিস্তৃত জাল বিস্তার করছে, যা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতিই নয়, বরং একটি জাতির সম্মানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মিশরে অবস্থানরত কিছু বাংলাদেশি নামধারী “ছাত্র” নিজেদের পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে গড়ে তুলেছে এক বিপজ্জনক প্রতারণা-চক্র। তারা দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সামনে আল-আজহারে ভর্তি, তথাকথিত “মিনহা” (বৃত্তি), কিংবা দ্রুত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়ে প্রলুব্ধ করে। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় এ ভর্তি ও বৃত্তি অর্জন একটি কঠোর, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া; যা কোনো দালালি বা ব্যক্তিগত প্রভাবের মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এই প্রতারণা কেবল ভ্রান্ত প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বিস্তার আরও গভীর ও বিপজ্জনক। কোথাও ভুয়া স্কলারশিপের নামে অর্থ আত্মসাৎ, কোথাও নকল সিল-স্ট্যাম্প ব্যবহার করে জাল কাগজপত্র প্রস্তুত, আবার কোথাও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের আড়ালে অবৈধ ডলার ব্যবসা। আরও ভয়াবহ হলো এই চক্রের কিছু অংশ ইউরোপমুখী মানবপাচারের সঙ্গেও সম্পৃক্ত, যেখানে “আজহারের ছাত্র” পরিচয় একটি ছদ্মাবরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো সদ্য হিফজ সম্পন্ন করা তরুণদের টার্গেট করা। ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে “আজহারে ভর্তির নিশ্চয়তা”র মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের মিশরে আনা হচ্ছে, পরে তারা পড়ছে অনিশ্চয়তা, আর্থিক শোষণ ও আইনি জটিলতার ফাঁদে। কেউ কেউ তথাকথিত “মারকাজ” প্রতিষ্ঠা করে এই দালালি কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার অপচেষ্টাও চালাচ্ছে, যা মূলত প্রতারণার এক সুসংগঠিত রূপ।
এই অসাধু কার্যক্রমের সরাসরি প্রতিক্রিয়া পড়ছে মিশরে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির ওপর। “একামা” বা বৈধ আবাসনসংক্রান্ত জটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, প্রশাসনিক নজরদারি কঠোর হচ্ছে, এবং সামগ্রিকভাবে একটি সৎ ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থীসমাজকে অযথা সন্দেহের মুখে পড়তে হচ্ছে। একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর অপরাধের দায়ভার বহন করতে হচ্ছে বৃহত্তর কমিউনিটিকে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইতোমধ্যে এ ধরনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে কোনো ধরনের দালালি, জালিয়াতি বা অবৈধ কর্মকাণ্ডকে তারা সম্পূর্ণভাবে নাকচ করেছে এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে। এই অবস্থান কেবল প্রশাসনিক দায়বদ্ধতা নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রক্ষার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা।
আজ প্রশ্নটি কেবল প্রতারণার নয়, এটি আস্থা, নৈতিকতা এবং জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন। আল-আজহার কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় এটি মুসলিম বিশ্বের একটি জ্ঞানিক প্রতীক। সেই প্রতীকের সঙ্গে প্রতারণার ছায়া যুক্ত হওয়া মানে একটি সভ্যতার আলোকস্তম্ভকে কলুষিত করা।
অতএব, এখন প্রয়োজন সর্বস্তরের সচেতনতা ও সতর্কতা। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের বুঝতে হবে শিক্ষার কোনো শর্টকাট নেই, জ্ঞানের কোনো দালাল নেই। যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো প্রলোভনে পা দেওয়া মানেই অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যাওয়া।
যারা এই পবিত্র নামকে ব্যবহার করে প্রতারণার ব্যবসা গড়ে তুলেছে, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনগত প্রতিরোধ গড়ে তোলা সময়ের দাবি। কারণ ইতিহাস কখনো ক্ষমা করে না তাদের, যারা জ্ঞানের পবিত্র আলোকে ব্যক্তিস্বার্থের অন্ধকারে বিকিয়ে দেয়।
লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহকারী সম্পাদক : মোঃ ছাব্বির হোসেন
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
নির্বাহী সম্পাদক : মেছবাহ উদ্দিন (01884-553490, 01911-206989)
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.