২০১৮ সালের নিশিরাতের নির্বাচনের ‘কারিগর’ জেলা প্রশাসকগন।
মোঃ আরিফুল ইসলাম মুরাদ সিনিয়র সাংবাদিক দৈনিক বাংলার সংবাদ,,,,,
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৎকালীন সময়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী আমলাদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই আমলাদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে কেবল আর্থিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারই নয়, বরং নৈতিক স্খলন ও নারী কেলেঙ্কারির মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
হাসিনার পাতানো ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিটি জেলার প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা বা রিটার্নিং অফিসারের গুরুদায়িত্ব পালন করেছিলেন এই জেলা প্রশাসকরা।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের প্রত্যক্ষ মদদে এবং সম্পূর্ণ প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ খাটিয়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে ভোট কারচুপির এক নজিরবিহীন পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল।
তাঁদের অধীনে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ড এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) একজোট হয়ে মাঠপর্যায়ে বেপরোয়া ভূমিকা পালন করেন।
এই নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে দীর্ঘকাল ধরে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও সমালোচনা চলছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে 'রাতের ভোট' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। প্রভাবশালী ও নির্দিষ্ট প্রার্থীদের অনৈতিকভাবে বিজয়ী করতে এই আমলারা বিশাল অঙ্কের আর্থিক সুবিধা, প্লট-ফ্ল্যাটসহ বিভিন্ন অবৈধ সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নির্বাচনে বিতর্কিত ও পক্ষপাতমূলক ভূমিকা রাখার পুরস্কারস্বরূপ এই ৫৭ জন জেলা প্রশাসকের অনেকেই পরবর্তী সময়ে দ্রুত পদোন্নতি পান।
তাঁদের অনেককেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব, সচিব এবং বিভাগীয় কমিশনারের মতো শীর্ষ পদে পদায়ন করা হয়।
তবে গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনের এই স্তরে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এদের অনেকেই ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হন কিংবা অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি হন।
সম্প্রতি ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় দায়িত্বে থাকা ৩৩ জন সাবেক পুলিশ সুপারকে (এসপি) বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর পর, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে 'ভোটের কারিগর' হিসেবে কাজ করা এই জেলা প্রশাসকদের বিষয়েও একই রকম কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, নির্বাচন পরিচালনায় জেলা প্রশাসকরাই ছিলেন জেলার প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, ফলে তাঁদের ভূমিকা যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে শাস্তির আওতায় আনা জরুরি।
তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করা যে ৫৭ জন জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের বিভাগভিত্তিক তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. ঢাকা বিভাগ: আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান (ঢাকা), ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর (গাজীপুর), রাব্বী মিয়া (নারায়ণগঞ্জ), সায়লা ফারজানা (মুন্সীগঞ্জ), মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী (কিশোরগঞ্জ), মো. শহীদুল ইসলাম (টাঙ্গাইল), সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন (নরসিংদী), মো. ওয়াহিদুল ইসলাম (মাদারীপুর), মো. কাজী আবু তালেব (শরীয়তপুর), উম্মে সালমা তানজিয়া (ফরিদপুর), এস এম ফেরদৌস (মানিকগঞ্জ), মোহাম্মদ মোখলেসুর রহমান সরকার (গোপালগঞ্জ), মো. শওকত আলী (রাজবাড়ী)।
২.ময়মনসিংহ বিভাগ: ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস (ময়মনসিংহ), মঈনউল ইসলাম (নেত্রকোনা), আহমেদ কবীর (জামালপুর - যিনি পরবর্তীতে ওএসডি ও পদাবনতি পেয়েছিলেন), আনার কলি মাহবুব (শেরপুর)।
৩. সিলেট বিভাগ:** এম কাজী এমদাদুল ইসলাম (সিলেট), মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ (সুনামগঞ্জ), মো. তোফায়েল ইসলাম (মৌলভীবাজার), মাহমুদুল কবীর মুরাদ (হবিগঞ্জ)।
৪. চট্টগ্রাম বিভাগ:** মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন (চট্টগ্রাম), এ কে এম মামুনুর রশিদ (রাঙামাটি), মোহাম্মদ দাউদুল ইসলাম (বান্দরবান), মো. শহীদুল ইসলাম (খাগড়াছড়ি), মো. কামাল হোসেন (কক্সবাজার), অঞ্জন চন্দ্র পাল (লক্ষ্মীপুর), মো. মাজেদুর রহমান খান (চাঁদপুর), মো. ওয়াহিদুজ্জামান (ফেনী), তন্ময় দাস (নোয়াখালী), মো. আবুল ফজল মীর (কুমিল্লা), হয়াত-উদ-দৌলা খান (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)।
৫.রাজশাহী বিভাগ: এস এম আব্দুল কাদের (রাজশাহী), এ জেড এম নুরুল হক (চাঁপাইনবাবগঞ্জ), মো. মিজানুর রহমান (নওগাঁ), মো. শাহরিয়াজ (নাটোর), জসিম উদ্দিন (পাবনা), ফয়েজ আহমেদ (বগুড়া), কামরুন নাহার সিদ্দীকা (সিরাজগঞ্জ), মোহাম্মদ জাকির হোসেন (জয়পুরহাট)।
৬.খুলনা বিভাগ: মোহাম্মদ হেলাল হোসেন (খুলনা), তপন কুমার বিশ্বাস (বাগেরহাট), এস এম মোস্তফা কামাল (সাতক্ষীরা), মো. আব্দুল আওয়াল (যশোর), মো. আলী আকবর (মাগুরা), সরোজ কুমার নাথ (ঝিনাইদহ), আনজুমান আরা (নড়াইল), মো. আসলাম হোসেন (কুষ্টিয়া), মো. আতাউল গনি (মেহেরপুর), গোপাল চন্দ্র নাথ (চুয়াডাঙ্গা)।
৭.বরিশাল বিভাগ:এস এম্্ অজিয়র রহমান (বরিশাল), মো. হামিদুল হক (ঝালকাঠি), আবু আহমেদ সিদ্দিকী (পিরোজপুর), মো.মতিউল ইসলাম চৌধুরী (পটুয়াখালী), কবীর মাহমুদ (বরগুনা), মোহাম্মদ মাসুদ আলম ছিদ্দীক (ভোলা)।
৮. রংপুর বিভাগ:এনামুল হাবীব (রংপুর)।
কিন্তু দু:খের বিষয় কয়েকজন ওএসডি বাদে অনেকেই আছে সচিবালয় সহ বিভিন্ন পদে।
জুলাইয়ের রক্তস্নাত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গঠিত নতুন বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন অধ্যায়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের শুদ্ধিশুদ্ধি ও জবাবদিহিতা অত্যন্ত জরুরি।
বিগত সরকারের ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে কাজ করা, জনগণের ভোটাধিকার হরণকারী এবং সীমাহীন দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এই আমলা, ইউএনও, এসিল্যান্ড ও পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.