হত্যাকান্ড: চট্টগ্রামের হালিশহরের অন্ধ হাফেজ আই এস আই এর এজেন্ট ছিল
ড. আবদুল আউয়াল
সাবেক উপাচার্য , সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড নিয়ে প্রয়াত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান
তার লেখা “ মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকান্ড “ গ্রন্থে এই বর্বর হত্যাকান্ডে মার্কিন অবস্থানের সুস্পষ্ট দালিলিক প্রমাণ সন্নিবেশিত রয়েছে । ঐতিহাসিক দলিলগুলো প্রমাণ করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড দীর্ঘ মেয়াদী দেশি -বিদেশী ষড়যন্ত্রের ফল ।
ষড়যন্ত্র শুরু ঊনসত্তর থেকেই : মার্কিন দলিলে মুজিব হত্যাকান্ড গ্রন্থে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ প্রকাশিত অনেক দলিল সংযোজন ও বিশ্লেষণ করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ প্রেক্ষাপট বর্ণনা করা হয়েছে । এই গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী , ১৯৬৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় মার্কিন কনস্যুলেট থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো বার্তায় বলা হয় , “ ২৩ ডিসেম্বর , ১৯৬৯ , শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ডেপুটি চিপ অব মিশন সিডনী শোবার এবং কনসাল ইন চার্জ সাক্ষাৎ করেন । এ সময় আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিব তার বিরুদ্ধে হত্যা ষড়যন্ত্রের তত্ব দেন । মুজিব বলেন , ২০ ডিসেম্বর ১৯৬৯ তিনি বিষয়টি সম্পর্কে প্রথম জানতে পারেন , কিন্তু তখন গুরুত্ব দিতে চান নি । কিন্তু ২২ ডিসেম্বর ১৯৬৯ তিনি এ বিষয়ে যাচাইকৃত সাক্ষ্য প্রমাণ পেয়েছেন । তার মনে আর কোন সন্দেহ নেই যে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে । এই বার্তায় আরও বলা হয় ,শেখ মুজিব বিশ্বাস করেন ষড়যন্ত্রকারীদের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মধ্যকার একটি ক্ষুদ্র চক্র রয়েছে । পূর্ব পাকিস্তানের জন্য একটি বৃহত্তর স্বায়ত্বশাসনের ধারণা তারা মানতে পারছেন না । দুই আততায়ীর মধ্যে একজন ইতিমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে এসে পৌছেছেন “। এই বার্তার শেষে তৎকালীন মার্কিন কনস্যুলেটের পলিটিক্যাল অফিসার এন্ড্রু আই কিলগোর নিজের মন্তব্যে লিখেন, “ মুজিবের হত্যার ষড়যন্ত্র সত্য মিথ্যা যাই হোক , মনে করিয়ে দেওয়ার পক্ষে এটা একটা সময়োপযোগী বিষয় যে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কল্পনাতীতভাবে শূন্যের কোঠায় । আসন্ন অবাধ রাজনৈতিক কার্যক্রমকালে , বিশেষ করে শেখ মুজিবকে হাজার হাজার , এমনকি লাখো লোকও ঘিরে থাকবে --- এ রকম ভিড়ের মধ্যে একজন আততায়ী তার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিতে পারে এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য তার ফল হয়ে উঠতে পারে বিয়োগান্ত”।
স্বাধীন বাংলাদেশেও ষড়যন্ত্র অব্যাহত থাকে । ঢাকার মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তা নিউবেরী কর্তৃক পাঠানো এক বার্তায় (ডকুমেন্টস নং -কনফিডেন্টশিয়াল , ঢাকা -৩১৫৬ ) বলা হয় , ১৯৭২ সালের শুরুতেই শেখ মুজিব সরকারের অগোচরে মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে গিয়েছিল অস্ত্র সংগ্রহের ব্যাপারে আলোচনা করতে । ১৯৭৩ সালের ১১ জুলাই আবারো মার্কিন দূতাবাসে যান মেজর ফারুকের ভাইরা ভাই আবদুর রশীদ । তিনি তখন জানিয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটির পক্ষ থেকে সেনাবাহিনীর জন্য অস্ত্র ক্রয় নিয়ে কথা বলতে তাকে পাঠানো হয়েছে । এর পর সিক্রেট ডকুমেন্টস নং ২১৫৮ তে বলা হয়েছে , ১৯৭৪ সালের ১৩ মে সৈয়দ ফারুক রহমান উচ্চতম পর্যায়ের বাংলাদেশ সেনা কর্মকর্তার নির্দেশে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার উত্খাতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহায়তা চেয়েছেন ।
ভারতীয় লেখক বিক্রমাদিত্যের “কনফিডেন্সিয়াল ডায়েরি” গ্রন্থে যুক্তরাষ্ট্রের হাইজ অব ফরেন এফেআর্সের রিপোর্টের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে , ১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশকে ঘিরে নতুন মিশন শুরু তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী কিসিঞ্জারের , যার মূল লক্ষ ছিল সিআইএর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সরিয়ে দিয়ে সদ্য স্বাধীন দেশকে গভীর রাজনৈতিক সংকটে ফেলা । এ জন্য তারা পাকিস্তান ফেরত ১১৩ জন পুলিশ সদস্যকে নিয়ে গিয়ে আমেরিকা ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ একাডেমিতে স্পেশাল অপারেশন ফোর্সেস (ওপিএস ) প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় । এই ট্রেনিং প্রাপ্তদের ৪০ জন বঙ্গবন্ধু হত্যার সময় বাংলাদেশের ইন্টিলিজেনসে ছিলেন এবং তাদের প্রায় সবার সংগে সিআইএর সম্পর্ক ছিল । পরে তাদের সবাই জেনারেল জিয়াউর রহমান সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পান ।
“কনফিডেন্সিয়াল ডায়েরিতে “ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের বিবরণ দিয়ে লেখা হয়েছে , “ ১৪ আগস্ট দিবাগত রাতে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বোস্টার বাসায় ছিলেন না । আর ভোর চারটায় দূতাবাসের নিজের কক্ষে গিয়েছিলেন ঢাকার তৎকালীন সিআইএ মিশন প্রধান ফিলিপ চেরি । কাছাকাছি দুটি ভবনে অবস্থান করছিলেন দুই আমলা –মাহবুব আলম চাষী এবং তাহের উদ্দিন ঠাকুর । বত্রিশ নাম্বারে যখন গোলাগুলি চলছিল, তখন মাহবুব আলম চাষী ও তাহের উদ্দিন ঠাকুর দ্রুত বাংলাদেশ বেতারের কাছাকাছি চলে যান । কিছুক্ষণ পর নিয়ে আসা হয় খন্দকার মোশতাক আহমদকে । এদিকে সিআইএর প্রধান ফিলিপ চেরি বার্তা পাঠান ওয়াশিংটনে । অনুসন্ধানে দেখা যায় ভয়েস অব আমেরিকাতে বাংলাদেশ সময় ভোর সাড়ে পাচটার বুলেটিনে প্রথম বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর প্রচার করে । তখনকার প্রামাণিক দলিল অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু নিহত হন সকল ৫ টা থেকে ৬ টার মধ্যে । এ থেকে এটা বোঝা যায় যে , ভোর চারটায় মার্কিন দূতাবাস অফিসে আসা সিআইএ প্রধান ফিলিপ চেরি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের খবর আগাম ওয়াশিংটনে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন । পরে ফিলিপ চেরি ভারতের সাংবাদিক পরেশ সাহাকে দেওয়া সাক্ষাতকারে বলেছিলেন , মুজিব হত্যার খবরটি তিনি যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন । তিনি যখন মুজিব হত্যার খবর পাঠান ,বত্রিশ নাম্বারে এবং আশেপাশে তখনও অভ্যুথথান চলছিল । তার এই বক্তব্য প্রমাণ করে তিনি (ফিলিপ চেরি ) আগ থেকেই পুরো পরিকল্পনা সম্পর্কে খুব ভালভাবে জানতেন । বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার সময় দুই সিআইএ এজেন্ট জর্জ গ্রিফিন এবং হ্যারল্ড স্যান্ডারস ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন । হেনরি কিসিঞ্জারের খুবই ঘনিষ্ঠ এবং ডান হাত হিসেবে পরিচিত হ্যারল্ড স্যান্ডারস ঐ সময় ছিলেন টেস্ট ডিপার্টমেন্টের ডিরেক্টর অব ইন্টিলিজেন্স । জর্জ গ্রিফিন ছিলেন স্যান্ডারসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু যিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতার আমেরিকার কনস্যুলেটে সিআইএর এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন । কলকাতায় ঐ সময়ে জর্জ গ্রিফিনের সাথে সখ্য গড়ে উঠে বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী খন্দকার মোশতাক ও তার গংদের সাথে ।
মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফসুলজ তার “ বাংলাদেশ : দ্যা আনফিনিশড রেভল্যুশন “ বইয়ে উল্লেখ করেন যে ,ঢাকায় দেখা যাচ্ছে যে সেখানকার মার্কিন দূতাবাস তিন দিন আগেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ছুটির দিন বলে ঘোষণা করেছে । এ ছুটি ছিল তালিকা বহির্ভূত ছুটির তালিকা । আর ঐ দিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয় । ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস ঐ ১৫ আগস্ট হঠাৎ ছুটির দিন বলে ঘোষণা করেছিল কেন?কারণ তাদের কাছে আগাম খবর ছিল ঐদিন সেনাবাহিনীর একদল চক্রান্তকারী অফিসার শেখ মুজিবকে হত্যা করবে। ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ প্রধান ফিলিপ চেরি নিজেই স্বীকার করেছেন চক্রান্তকারীদের সাথে বরাবরই তার যোগাযোগ ছিল । লরেন্স লিফসুলজ আরো লিখেছেন ,১৪ আগস্ট ১৯৭৫ দিবাগত সারা রাত ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে চলছিল অসীম কর্মব্যস্থতা । দূতাবাসের উচ্চ পদস্থ অফিসারদের অধিকাংশ অফিসারই সেদিন ঘুমাতে যান নি । প্রধান সচিব সহ বেশির ভাগ সিনিয়র কর্মকর্তা সারারাত দূতাবাস অফিসেই ছিলেন ।
অন্যদিকে মার্কিন লেখক যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক ড: পামেলা কে গিলবার্ট ২০০২ সালে তার” ইমাজিনড লন্ডনস” বইয়ে লিখেছেন , “ সিআইএ মুজিব হত্যায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে যুক্ত থাকা প্রতিক্রিয়াশীল বাঙালিদের ব্যবহার করেছিল । “। আরেক মার্কিন লেখক স্টানলি উলপার্ট তার বিখ্যাত গ্রন্থ : জুলফিকার ভুট্টো অব পাকিস্তান : হিজ লাইফ এণ্ড টাইমস “ গ্রন্থে লিখেছেন , ১৯৭৫ সালের জুনে পাকিস্তানের কাকুলে সামরিক একাডেমিতে দেওয়া বক্তব্যে ভুট্টো বলেছিলেন ,”এ অঞ্চলে শীঘ্রই কিছু পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে “ । উলপার্ট আরো লিখেছেন,বংলাদেশে কয়েকটি মুজিব বিরোধী রাজনৈতিক দলকে প্রেসিডেন্ট ভুট্টো নিয়মিত আর্থিক সহায়তা দিতেন, যা ছিল তার ইচ্ছামাফিক পরিবর্তনের জন্য বিনিয়োগ । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন বিদেশ মন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের যে কজন বিদেশি শত্রু ছিল , বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম । বাকি দুইজন চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দ্রে এবং ভিয়েতনামের রাষ্ট্রনায়ক থিউ । এই তিন জনই বারবার তার পরিকল্পনাকে বানচাল করে দিয়েছিল । এ প্রসঙ্গে হেনরি কিসিঞ্জারের স্টাফ এসিসটেন্ট রজার মরিস লিখেছেন , একাত্তরের স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মকে তিনি ( হেনরি কিসিঞ্জার ) নিজের পরাজয় হিসেবে দেখতেন । এ জন্য তিনি শুরু থেকেই বাংলাদেশ বিরোধী দৃঢ় অবস্থান নেন । ঘটনা প্রবাহ বিশ্লেষণে দেখা যায় , সিআইএ ওয়াশিংটন থেকে করাচি হয়ে ঢাকা পর্যন্ত শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল , যে নেটওয়ার্কে পাকিস্তানের প্রধান মন্ত্রী ভুট্টো থেকে শুরু করে বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ খুনী সহ খন্দকার মোশতাক ,উপপ্রধান জিয়াউর রহমান ,উচ্চ পদস্থ আমলা মাহবুব আলম চাষী , তাহের উদ্দিন ঠাকুর সহ সবাই সম্পৃক্ত ছিলেন ।
আরেকটি চমকপ্রদ খবর এনথনি মাসকারেনহাসের লেখা ,” বাংলাদেশ, এ লিগাসি অফ ব্লাড “ বই থেকে জানা যায় যে ঐ সময় চট্রগ্রামের হালিশহরে একজন অন্ধ বিহারি হাফেজ থাকতেন । তিনি নাকি একজন কামেল পীর , ভূত ভবিষ্যত বলতে পারতেন । ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট খুনী ফারুক রহমানের স্ত্রী ফরিদা রহমান হালিশহরে ওই অন্ধ হাফেজের কাছে যান এবং ফারুকরা সেই রাতেই কাজ সম্পন্ন করতে চাচ্ছেন –এ ব্যাপারে তার পরামর্শ চান । প্রত্যুত্তরে অন্ধ বিহারি হাফেজ অতিসত্তর কাজ সেরে ফেলার পরামর্শ দেন । পরবর্তীতে জানা গেল যে এই তথাকথিত অন্ধ পীর হাফেজ কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর পক্ষে বংলাদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন । অথচ তার কোন কিছুই বাংলাদেশে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানতে পারল না ।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.