স্বাধীনতা নাকি অনুমতির শৃঙ্খল
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
রাষ্ট্রের স্বাধীনতা কেবল একটি পতাকা, একটি মানচিত্র বা একটি সংবিধানের ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তার প্রকৃত পরীক্ষা হয় অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায়। আজ সেই জায়গাতেই প্রশ্নের মুখে বাংলাদেশ। রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের "অনুমতি" এই একটি শব্দই যেন রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার ভেতরের অস্বস্তিকর সত্যকে নগ্ন করে দিয়েছে। প্রশ্ন জাগে বাংলাদেশ কি সত্যিই স্বাধীন, নাকি বৈশ্বিক শক্তির ছায়াতলে পরিচালিত একটি অনুগত অর্থনৈতিক কাঠামো?
আন্তর্জাতিক রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হলো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো আর সরাসরি শাসন করে না, তারা নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনীতি, জ্বালানি, ব্যাংকিং এবং নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে। ডলারের একচেটিয়া আধিপত্য, বৈশ্বিক লেনদেন ব্যবস্থার ওপর পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ, এবং নিষেধাজ্ঞার ভীতি এসবই আজকের বিশ্বে “অনুমতি” শব্দটিকে অদৃশ্য কিন্তু বাধ্যতামূলক শর্তে পরিণত করেছে। ফলে একটি রাষ্ট্র মুখে স্বাধীন হলেও বাস্তবে তাকে অন্যের নীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হয়।
কিন্তু এখানেই প্রশ্নের তীক্ষ্ণতা এই নির্ভরতা কি কৌশলগত, নাকি আত্মসমর্পণমূলক? বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্যিক বাস্তবতা সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কথিত বাণিজ্যিক সমঝোতা যেখানে বিমান ক্রয়, জ্বালানি আমদানি এবং কৃষিপণ্য কেনার মতো বাধ্যবাধকতার কথা শোনা যাচ্ছে তা যদি সত্য হয়, তবে এটি কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং অর্থনৈতিক নীতির ওপর এক গভীর প্রভাব বিস্তারকারী সিদ্ধান্ত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। রাষ্ট্র যখন নীরব থাকে, তখন গুজবই বাস্তবতার জায়গা দখল করে নেয়। একটি সরকার যদি জনগণের অর্থনীতি, ভবিষ্যৎ এবং কৌশলগত অবস্থানকে প্রভাবিত করে এমন চুক্তি গোপন রাখে, তবে তা কেবল স্বচ্ছতার ঘাটতি নয়, বরং জবাবদিহিতার সংকট।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে “দাসত্ব” শব্দটি বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে কখনো ভারতের প্রেক্ষাপটে, কখনো অন্য কোনো শক্তির ক্ষেত্রে। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। একটি রাষ্ট্র যদি এক শক্তির প্রভাব থেকে বের হয়ে আরেক শক্তির প্রভাববলয়ে প্রবেশ করে, তবে সেটি মুক্তি নয়, বরং নির্ভরতার রূপান্তর মাত্র। স্বাধীনতা তখন কেবল মালিকের পরিবর্তন, কাঠামোর নয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের যে জোরালো দাবি তোলা হয়েছিল, পরবর্তীতে তা নিয়ে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদি সত্যিই কোনো দাসত্বমূলক চুক্তি থেকে দেশকে মুক্ত করা হয়ে থাকে, তবে তার সুনির্দিষ্ট দলিল কোথায়? আর যদি তা না-ই থাকে, তবে সেই দাবির দায় কে নেবে?
একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়টি যদি বাস্তব হয়, তবে তার শর্তাবলি কেন জনসমক্ষে স্পষ্ট করা হচ্ছে না? কেন জনগণ জানতে পারছে না দেশের অর্থনীতি কোন পথে এগোচ্ছে, এবং সেই পথ কতটা স্বাধীন?
আজকের বিশ্বে সরাসরি উপনিবেশ নেই, কিন্তু অর্থনৈতিক নির্ভরতার শৃঙ্খল আরও সূক্ষ্ম, আরও গভীর। এটি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সিদ্ধান্তে, নীতিতে এবং বাণিজ্যে প্রতিফলিত হয়। একটি রাষ্ট্র যদি তার জ্বালানি কোথা থেকে কিনবে, কত দামে কিনবে, কিংবা কার কাছ থেকে কী শর্তে পণ্য আনবে এসব নির্ধারণে স্বাধীন না থাকে, তবে সেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে পড়বেই।
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বৈশ্বিক শক্তির চাপ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণের দুর্বলতা। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কৌশলগত দৃঢ়তা। কারণ স্বাধীনতা কখনো কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে টিকে থাকে না, তা টিকে থাকে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের সাহসে এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতায়।
পরিশেষ প্রশ্নটি সরল কিন্তু নির্মম, বাংলাদেশ কি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়, নাকি অন্যের অনুমতির অপেক্ষায় থাকে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমরা স্বাধীন, নাকি স্বাধীনতার ধারণার ভেতরে আবদ্ধ একটি বাস্তবতা।
লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহকারী সম্পাদক : মোঃ ছাব্বির হোসেন
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
নির্বাহী সম্পাদক : মেছবাহ উদ্দিন (01884-553490, 01911-206989)
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.