সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনে একাধিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করে প্রবাসী শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ভারতীয় শিক্ষাবিদ এন কে রামচন্দ্রন মেনন মারা গেছেন।
মো লুৎফুর রহমান রাকিব
আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি
ভাভান্স মিডল ইস্টের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান মেননের বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। বুধবার ভারতের কেরালায় তাঁর মৃত্যু হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে গালফ নিউজকে জানানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার আলুভায় পরিবারের বাড়িতে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, মেননের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শিক্ষা নেটওয়ার্ক বর্তমানে তিনটি দেশে ৯টি স্কুল ও দুটি প্রারম্ভিক শৈশব শিক্ষা কেন্দ্র পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে হাজারো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাঁর সর্বশেষ উদ্যোগ ছিল আবুধাবির পার্ল হেরিটেজ স্কুল, যা চলতি বছরের আগস্টে চালু হয়।
ব্যাংকার থেকে শিক্ষাবিদ
ভাভান্স মিডল ইস্ট ভারতের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভারতীয় বিদ্যা ভবনের একটি অংশ। ১৯৩৮ সালে ভারতের সংবিধান সভার সদস্য কে এম মুন্সি প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। মহাত্মা গান্ধীর আশীর্বাদ নিয়েই এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে ভারতে ভারতীয় বিদ্যা ভবনের অধীনে শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।
পেশাগত জীবনে ব্যাংকার মেনন ১৯৬৯ সালে কুয়েতে পাড়ি জমান। ২০০০ সালে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে ভারতীয় বিদ্যা ভবনের কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৬ সালে কুয়েতে তাঁর প্রথম প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান এডুকেশনাল স্কুল (আইইএস–ভাভান্স কুয়েত) চালু হয়।
পরবর্তী সময়ে তাঁর নেতৃত্বে শিক্ষা কার্যক্রম সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে বিস্তৃত হয়। আবুধাবিতে ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রাইভেট ইন্টারন্যাশনাল ইংলিশ স্কুল (PIES), যা ভাভান্স আবুধাবি নামে পরিচিত। ২০১৪ সালে আল আইন শহরে আল সাদ ইন্ডিয়ান স্কুল, ২০১৫ সালে বাহরাইন ইন্ডিয়ান স্কুল এবং ২০১৬ সালে কুয়েতে দ্য স্মার্ট ইন্ডিয়ান স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়।
এরপর ২০১৯ সালে আল আইনে ভাভান্স পার্ল উইজডম স্কুল, ২০২০ সালে দুবাইয়ে পার্ল উইজডম স্কুল এবং ২০২৩ সালে শারজায় ভাভান্স পার্ল উইজডম স্কুল চালু হয়। পাশাপাশি কুয়েতে আইইএসের অধীনে জ্যাক অ্যান্ড জিল প্রি-স্কুল এবং আবুধাবিতে পিকাডিলি নার্সারিও পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটি।
স্ত্রী ও দুই সন্তান রেখে গেলেন
মেনন স্ত্রী সুধা রামচন্দ্রন এবং দুই সন্তান দিব্যা রাজেশ রামচন্দ্রন ও সূরজ রামচন্দ্রনকে রেখে গেছেন। দুজনেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। দিব্যা ভাভান্স মিডল ইস্টের পরিচালক এবং সূরজ প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তাঁর মৃত্যুতে ভাভান্সের সব স্কুলে শোকের ছায়া নেমে আসে। শ্রদ্ধা জানাতে বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটির সব স্কুল নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা শোকসভা ও বিশেষ প্রার্থনায় অংশ নেয়। পরে তাদের ছুটি দেওয়া হয়। তাঁর শেষকৃত্যে অংশ নিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনের বিভিন্ন স্কুলের অধ্যক্ষ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা কেরালায় যান।
শিক্ষাঙ্গনে রেখে গেলেন গভীর ছাপ
সহকর্মীরা মেননকে একজন দূরদর্শী, উৎসাহদাতা ও অভিভাবকসুলভ নেতা হিসেবে স্মরণ করেছেন। তাঁদের মতে, তিনি শিক্ষকদের ওপর আস্থা রাখতেন এবং তাঁর নেতৃত্বে অনেক শিক্ষক ধীরে ধীরে অধ্যক্ষের দায়িত্বে উন্নীত হয়েছেন।
ভাভান্স আবুধাবির অধ্যক্ষ ড. কে টি নন্দকুমার বলেন, মেননের মৃত্যু প্রতিষ্ঠানটির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর ভাষায়, ব্যক্তিগতভাবে তিনি একজন অভিভাবক, পথপ্রদর্শক ও শিক্ষককে হারিয়েছেন, যাঁর উৎসাহ ও আস্থা তাঁর শিক্ষক থেকে অধ্যক্ষ হয়ে ওঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তিনি আরও বলেন, মেনন শুধু একজন চেয়ারম্যান ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী শিক্ষাবিদ, যাঁর নেতৃত্বে প্রজ্ঞা, বিনয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও মূল্যবোধের সমন্বয় দেখা গেছে। শিশুদের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কল্যাণ নিয়ে তাঁর আন্তরিকতা মধ্যপ্রাচ্যের হাজারো শিক্ষার্থীর জীবনে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
শারজার ভাভান্স পার্ল উইজডম স্কুলের অধ্যক্ষ ইন্দু পানিকার তাঁকে এমন একজন অসাধারণ নেতা হিসেবে স্মরণ করেছেন, যিনি শুধু প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেননি, বরং মানুষ তৈরি করেছেন।
ভাভান্স মিডল ইস্টের ইউএই মার্কেটিং ম্যানেজার ও মুখপাত্র অমৃতা রঞ্জিত বলেন, মেননের কাছে শিক্ষা মানে শুধু ভালো ফলাফল অর্জন নয়। তাঁর লক্ষ্য ছিল দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল ও নীতিবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা। তরুণদের সক্ষমতার ওপর তাঁর গভীর বিশ্বাস ছিল এবং শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কল্যাণের প্রতিও তিনি সমানভাবে যত্নশীল ছিলেন।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.