শাকের দাম দ্বিগুণ, লাভের হাসি চাষিদের মুখে
রংপুর অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে ‘মারা শাক’
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
রংপুর অঞ্চলে টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন ধরনের শাকের খেত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমেছে। ফলে এক মাসের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের শাকের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন পর প্রত্যাশিত দাম পেয়ে খুশি শাকচাষিরা। বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলের জনপ্রিয় আঞ্চলিক সবজি ‘মারা শাক’ চাষ করে ভালো লাভ করছেন কৃষকরা।
কৃষক, ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলে লাল শাক, পালং শাক, কলমি শাক, পুঁই শাক, লাউ শাকসহ বিভিন্ন ধরনের শাকের বাণিজ্যিক চাষ হলেও সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হচ্ছে মারা শাক। এটি মূলত উত্তরাঞ্চলের একটি আঞ্চলিক খাদ্যাভ্যাসের অংশ। প্রায় প্রতিটি পরিবারেই নিয়মিত এ শাক রান্না করা হয়। স্থানীয় বাজারগুলোতেও সারা বছর এর চাহিদা থাকে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছর এ সময়ে বিভিন্ন শাকের দাম ছিল কেজিপ্রতি ১২ থেকে ১৫ টাকা। বর্তমানে সেই দাম বেড়ে হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। যদিও বাজারে মারা শাকের সরবরাহ তুলনামূলক ভালো রয়েছে, তবে অন্যান্য শাকের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সামগ্রিক বাজারে দাম বেড়েছে।
কৃষকদের ভাষ্য, চলতি মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে নিচু জমির অনেক শাকের খেত নষ্ট হয়েছে। তবে মারা শাক তুলনামূলক দ্রুত উৎপাদনযোগ্য হওয়ায় অনেক কৃষক এই শাকের দিকে ঝুঁকছেন। বীজ বপনের মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যেই এটি বাজারজাত করা যায়।
কৃষি বিভাগ জানায়, মূলত পাটের বীজ ঘন করে বপনের পর গাছ এক থেকে দেড় ফুট উচ্চতা হলে জমি পরিষ্কার করার উদ্দেশ্যে চারা তুলে ফেলা হয়। সেই কচি চারাই স্থানীয়ভাবে 'মারা শাক' নামে পরিচিত। শাক সংগ্রহের পর জমিতে মই দিয়ে মাটি সমান করে পাটের মূল ফসলের পরিচর্যা করা হয়। এই প্রক্রিয়া থেকেই শাকটির নাম হয়েছে 'মারা শাক'। দেশের অন্য অঞ্চলে এটি তেমন পরিচিত না হলেও রংপুর অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে এটি জনপ্রিয় খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর এ অঞ্চলে গড়ে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের শাকের আবাদ হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমিতে মারা শাক চাষ করা হয়। স্বল্প সময়ে উৎপাদন, কম খরচ এবং বাজারে স্থায়ী চাহিদা থাকায় কৃষকদের কাছে এটি একটি লাভজনক ফসল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার ফুলগাছ গ্রামের কৃষক লুৎফর রহমান (৬০) জানান, তিনি সারা বছর ২০ শতাংশ জমিতে মারা শাক চাষ করেন। বছরে সাত থেকে আটবার বীজ বপন করে শাক উৎপাদন করেন।
তিনি বলেন, "একেকবার শাক উৎপাদনে প্রায় চার হাজার টাকা খরচ হয়। ২০ শতাংশ জমি থেকে ৮০০ থেকে ৯০০ কেজি শাক পাওয়া যায়। কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ পড়ে মাত্র ৪ থেকে ৫ টাকা।"
তিনি আরও বলেন, "এক মাস আগেও পাইকারদের কাছে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন একই শাক বিক্রি করছি ১৮ থেকে ২০ টাকায়। বাজারে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে। এ বছর মারা শাক চাষ করে বেশ লাভবান হয়েছি। কখনো লাভ কম হয়, কখনো বেশি হয়, তবে এ শাক চাষ করে কখনো লোকসান হয়নি।"
রংপুরের মাহিগঞ্জ এলাকার কৃষক মন্তোষ চন্দ্র বর্মণ (৬৫) বলেন, তাদের গ্রামের ৫৫টি কৃষক পরিবার প্রায় সবাই শাক-সবজির আবাদ করেন। তবে মারা শাকই সবচেয়ে বেশি উৎপাদন করেন।
তিনি বলেন, "আমি এক বিঘা জমিতে সারা বছর বাণিজ্যিকভাবে মারা শাক চাষ করি। অনেক পাইকার আগাম টাকা দিয়ে শাকের অর্ডার দেন। তবে এ শাক চাষে যথেষ্ট যত্ন নিতে হয়। বীজ বপনের পর অতিবৃষ্টি হলে অনেক সময় বীজ নষ্ট হয়ে যায়, তখন আবার নতুন করে বপন করতে হয়। তারপরও লাভ ভালো হওয়ায় আমরা এ শাকের আবাদ বাড়াচ্ছি।"
রংপুর সিটি বাজারে কেনাকাটা করতে আসা সহিদুল ইসলাম বলেন, "আমাদের পরিবারে সব ধরনের শাক খাওয়া হলেও মারা শাকের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। সপ্তাহে অন্তত তিন দিন এই শাক রান্না হয়। তবে গত বছরের তুলনায় এবার শাকের দাম অনেক বেড়েছে।"
সিটি বাজারের সবজি ব্যবসায়ী জুলহাস হোসেন বলেন, "কৃষকদের কাছ থেকে মারা শাক কিনে বাজারে বিক্রি করি। কেজিপ্রতি ৭ থেকে ৮ টাকা লাভ থাকে। তবে পরিবহন খরচ ও বিক্রি না হলে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। এবার মারা শাকের সরবরাহ মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও অন্য শাকের সরবরাহ কম হওয়ায় বাজারে দাম বেড়েছে।"
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, "গত এক যুগে রংপুর অঞ্চলে মারা শাকের জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে। আগে এটি এতটা পরিচিত ছিল না। বর্তমানে পাটের বীজ থেকে উৎপাদিত এই শাক স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অংশ হয়ে উঠেছে। দেশের অন্য অঞ্চলে এর প্রচলন খুবই সীমিত।"
তিনি বলেন, "মারা শাক শুধু সুস্বাদুই নয়, এটি পুষ্টিকরও। অনেকেই রোগীর পথ্য হিসেবেও এটি ব্যবহার করেন। স্বল্প জমি, কম খরচ এবং অল্প সময়ে উৎপাদনের কারণে কৃষকরা এ শাক চাষ করে ভালো আয় করছেন। একই সঙ্গে নিজেদের পরিবারের পুষ্টির চাহিদাও পূরণ করতে পারছেন।"
’জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ও দ্রুত ফলনশীল ফসল হিসেবে মারা শাকের চাষ আগামী দিনে আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। বাজারে স্থায়ী চাহিদা ও লাভজনক মূল্য কৃষকদের এই আঞ্চলিক শাকের আবাদে আরও উৎসাহিত করছে,’ তিনি বলেন।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.