রাতে গোপনে বালু উত্তোলন, দিনে প্রকাশ্যে বিক্রি
ব্রহ্মপুত্রপাড়ে আবারও সক্রিয় বালু সিন্ডিকেট
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্ট।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
কুড়িগ্রামের চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের বালুর সুনাম বহুদিনের। নির্মাণকাজে উন্নতমানের হওয়ায় জেলার গণ্ডি পেরিয়ে রংপুর, লালমনিরহাটসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সেই চাহিদাকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী বালু সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, গভীর রাতে ড্রেজার মেশিন দিয়ে অবৈধভাবে নদ থেকে বালু উত্তোলন করে দিনের আলোয় প্রকাশ্যে বিক্রি করছে সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন সড়কের পাশে 'এখানে চিলমারীর বালু পাওয়া যায়'—এমন সাইনবোর্ড টাঙিয়ে প্রকাশ্যেই চলছে বালু বিক্রি। স্থানীয়দের দাবি, পুরো উপজেলাজুড়ে ব্রহ্মপুত্রপাড়ে প্রায় ১০০টি স্থানে এভাবে বালুর স্তূপ করে রাখা হয়েছে। রাতের আঁধারে নদ থেকে বালু তুলে নির্দিষ্ট স্থানে মজুত করা হয়, পরে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ট্রাকে করে বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু ব্যবসার সঙ্গে প্রভাবশালী একটি চক্র জড়িত থাকায় কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পান না। প্রতিবাদ করলেই শারীরিক নির্যাতন কিংবা মিথ্যা মামলার ভয় দেখানো হয়।
রমনা এলাকার বাসিন্দা নুর ইসলাম (৫৫) বলেন, "বালু সিন্ডিকেটের কাছে গ্রামের মানুষ একপ্রকার জিম্মি। কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। যারা প্রতিবাদ করে, তাদের হয়রানি কিংবা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হয়।"
তিনি আরও বলেন, "প্রায় আট-নয় মাস আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। এতে অবৈধ বালু উত্তোলন অনেকটা বন্ধ হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে সিন্ডিকেট আবার আগের মতো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অভিযোগ জানানো হলেও এখন আর তেমন অভিযান দেখা যায় না।"
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন শত শত ট্রাক বালু পরিবহনের কারণে গ্রামের কাঁচা-পাকা সড়ক এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তারা জানান, ব্রহ্মপুত্রের তীররক্ষা বাঁধ, গ্রামীণ সড়ক ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষায় অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও সমন্বিত অভিযান চালানোর পাশাপাশি জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় প্রতিবছরের নদীভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিও বাড়তে থাকবে।
কাচকোল এলাকার বাসিন্দা আকবর আলী (৬০) বলেন, "ড্রেজার দিয়ে নদীর তীরঘেঁষে বালু তোলার কারণে নদের কিনারে গভীর গর্ত তৈরি হচ্ছে। এতে পানির প্রবাহের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে তীররক্ষা বাঁধে সরাসরি আঘাত হানছে। ফলে বাঁধ ভাঙনের ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে।"
তিনি বলেন, "চিলমারীতে বহু বছর ধরেই এই অবৈধ বালু উত্তোলন চলছে। মাঝে মধ্যে প্রশাসনের অভিযান হলে কিছুদিন বন্ধ থাকে, পরে আবার আগের মতো শুরু হয়। ব্রহ্মপুত্রের ডান তীরে যে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়, তার অন্যতম কারণ এই অবৈধ বালু উত্তোলন।"
কুড়িগ্রামে শহরের ঠিকাদার আফতাব হোসেন (৫০) বলেন, "ঢালাইয়ের কাজে চিলমারীর বালুর আলাদা কদর রয়েছে। এর দানার গঠন ও মান ভালো হওয়ায় প্রকৌশলীরাও এ বালু ব্যবহারের পরামর্শ দেন। এ কারণেই এর বাজারমূল্য ও চাহিদা দুটোই বেশি।"
রমনা এলাকার ট্রাকচালক সিরাজুল ইসলাম (৪০) জানান, প্রতি ট্রাক বালু ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় কেনা হয়। একটি ট্রাকে ১৩০ থেকে ১৩৫ ঘনফুট (সিএফটি) বালু বহন করা যায়। এসব বালু কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলায় পরিবহন করা হয়।
তিনি বলেন, "আমরা শুধু পরিবহনের কাজ করি। বালু কোথা থেকে বা কীভাবে উত্তোলন করা হয়, সে বিষয়ে কিছু বলতে পারব না।"
রমনা এলাকার বালু ব্যবসায়ী দিদারুল ইসলাম বলেন, "প্রতি ট্রাক বালু ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করি। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার টাকা চলে যায় বালু উত্তোলন, জায়গা ভাড়া এবং বিভিন্ন খাতে 'ম্যানেজ' করতে।"
'ম্যানেজ' বলতে কী বোঝাচ্ছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "সব কিছু খোলাসা করে বলা সম্ভব নয়। বিষয়টি বুঝে নিতে হবে। তবে বর্তমানে প্রশাসনিক কোনো ঝামেলা নেই।"
তিনি আরও দাবি করেন, প্রতিদিন তিনি গড়ে প্রায় ৫০ ট্রাক বালু বিক্রি করেন। উপজেলার অন্য পয়েন্টগুলোতেও প্রায় একই পরিমাণ বালু বিক্রি হয়।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, নদীর তীরসংলগ্ন এলাকায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন নদীভাঙনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
তিনি বলেন, "নদীর তীর থেকে অন্তত ৫০০ মিটার দূরে বালু উত্তোলন করলে সাধারণত ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তীর থেকে মাত্র ১০০ থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে ড্রেজার চালানো হচ্ছে। এতে নদীর তলদেশে গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়ে তীররক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পড়ে।"
তিনি আরও বলেন, "অবৈধ বালু উত্তোলন নদীভাঙনের অন্যতম কারণ। আমরা নিয়মিত স্থানীয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে আসছি।"
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান বলেন, "চিলমারীতে যে বালু সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তা শুধু উপজেলা প্রশাসনের একার পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড, নৌ পুলিশ, থানা পুলিশ এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।"
তিনি বলেন, "প্রশাসনিক নানা দায়িত্বের কারণে সবসময় অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। তবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রির বিরুদ্ধে আবারও অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।"
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.