রংপুরে সাংবাদিক উৎস হত্যা মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড, দুজনের যাবজ্জীবন
মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন করায় তাকে হত্যা করা হয়
রায়ে অসন্তুষ্ট নিহতের পরিবার।
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
২-৯-২০২৬
রংপুরে সাংবাদিক মশিউর রহমান ওরফে উৎস রহমান হত্যা মামলায় একজন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মামলার অপর আসামিদের বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত তিন আসামিই পলাতক রয়েছেন। বুধবার দুপুরে রংপুর মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মসিউর রহমান খান এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী ও নিহত সাংবাদিক উৎস রহমানের মা নুরজাহান বেগম। রায় ঘোষণার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এ রায়ে তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে পূর্ণাঙ্গ বিচার নিশ্চিত করার জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা জানান তিনি।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেন রুবেল ইসলাম ওরফে হেকরম। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অপর দুই আসামি হলেন লেলিন ইসলাম ওরফে এলিন এবং শুভ কুমার। তারা সবাই রংপুর নগরীর বাসিন্দা।
নিহত সাংবাদিক মশিউর রহমান উৎসের বয়স ছিল ৩২ বছর। তিনি নগরীর আলমনগর পীরপুর এলাকার মৃত শামসুল হুদা প্রামাণিকের ছেলে। তিনি রংপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক যুগের আলো পত্রিকার সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। পাশাপাশি রংপুর জেলা মফস্বল সাংবাদিক ফোরামের সদস্যসচিব এবং রংপুর সিটি প্রেসক্লাবের সদস্য ছিলেন।
পুলিশ ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০১৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর জিএল রায় রোডে দৈনিক যুগের আলো কার্যালয় থেকে দায়িত্ব পালন শেষে বের হন উৎস রহমান। এরপর তিনি আর বাড়ি ফেরেননি।
পরদিন সকালে নগরীর ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের কাছে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের পাশে একটি গাছের সঙ্গে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মাথায় ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছিল। মহাসড়ক থেকে কিছুটা দূরে গাছের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় মরদেহটি পড়ে ছিল।
এ ঘটনায় উৎসের মা নুরজাহান বেগম বাদী হয়ে রংপুর কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে মামলাটির তদন্তভার জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) দেওয়া হয়।
মামলার তদন্তে পুলিশ জানিয়েছিল, সাংবাদিক উৎস রহমান ধারাবাহিকভাবে মাদক কারবার ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন। এসব প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে একটি মাদক কারবারি চক্র তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এরই জেরে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়।
২০১৮ সালে পুলিশ আটজনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়। তারা হলেন—জহিরন আক্তার জুই ওরফে গেদী, তার সহযোগী রুপম ইসলাম, শুভ কুমার, রুবেল ইসলাম ওরফে হেকরম, রিপন মিয়া, লেলিন মিয়া, রোকসানা বেগম ও রুবেল মিয়া।
দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর পর বুধবার মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়। রায়ে আদালত রুবেল ইসলাম ওরফে হেকরমকে মৃত্যুদণ্ড এবং লেলিন ইসলাম ওরফে এলিন ও শুভ কুমারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। অপর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়।
রায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে দৈনিক যুগান্তরের রংপুর ব্যুরো প্রধান ও দৈনিক আমাদের প্রতিদিন-এর সম্পাদক মাহবুব রহমান হাবু বলেন, এ রায় সন্তোষজনক নয়।
তিনি বলেন, “দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা সবাই পলাতক। মামলার মূলহোতা হিসেবে যাকে আমরা মনে করি, সেই জহিরন আক্তার জুই ওরফে গেদীও খালাস পেয়েছেন। সব মিলিয়ে বিষয়টি বিস্ময়কর। আমরা আশা করি, উচ্চ আদালতে গেলে সাংবাদিক উৎস রহমান হত্যার প্রকৃত মাস্টারমাইন্ড খালাস পাবেন না।”
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, মামলার মূল অভিযুক্ত জহিরন আক্তার জুই ওরফে গেদী সাংবাদিক উৎস রহমান হত্যার মূলহোতা। অথচ আদালত তাকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন।
“এ রায়ে আমরা আইনজীবীসহ নিহতের পরিবার সংক্ষুব্ধ। এ মামলার বিষয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। হত্যার পর মূলহোতা পার পেয়ে গেলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা আরও বাড়বে,” বলেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও রংপুর মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আব্দুল হাদী বেলাল বলেন, দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং মামলার বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ বিস্তারিত পর্যালোচনা করে আদালত রায় দিয়েছেন।
তিনি বলেন, “রায়ে বাদীপক্ষ অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। আদালত সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন।”
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.