রংপুরে মহিপুর তিস্তা সেতু
পানির তীব্র স্রোতে ধসে যাচ্ছে সুরক্ষা বাঁধ, হুমকিতে সেতু ও সড়ক
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৭৬৯৭২
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর-কাকিনা আঞ্চলিক সড়কে তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত তিস্তা সড়ক সেতুর উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীর পানির তীব্র স্রোতের আঘাতে সেতুর সুরক্ষা বাঁধের সিসি (কংক্রিট) ব্লক ধসে পড়ছে এবং বাঁধের একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে শুধু তিস্তা সড়ক সেতু ও মহিপুর-কাকিনা আঞ্চলিক সড়কই নয়, আশপাশের অন্তত ছয়টি গ্রামের হাজারো মানুষ, বসতভিটা ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমি নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার পর শনিবার সন্ধ্যা থেকে সেতুর উত্তর-পশ্চিম অংশের প্রায় ৮০০ মিটার দীর্ঘ সুরক্ষা বাঁধে ভাঙন শুরু হয়। রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত প্রায় ৩৫ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনস্থলে সৃষ্টি হয়েছে প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ ফুট গভীর গর্ত। ফলে সেতুর অ্যাপ্রোচ সড়ক ও মূল কাঠামোও হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভাঙন আরও বিস্তৃত হয়ে সেতু ও সড়কের অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে তিস্তার পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতিরও সৃষ্টি করতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, “শনিবার সন্ধ্যা থেকে পানির প্রবল স্রোত সুরক্ষা বাঁধে সরাসরি আঘাত হানছে। একের পর এক সিসি ব্লক ধসে নদীতে চলে যাচ্ছে। ভাঙনের গতি ক্রমেই বাড়ছে। পুরো বাঁধটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেতু ও সড়ক মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। পাশাপাশি আশপাশের গ্রামগুলোও প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
স্থানীয় কৃষক জমসের আলী শেখ বলেন, “এই সুরক্ষা বাঁধ শুধু সেতু ও সড়ককে রক্ষা করছে না, এটি ছয়টি গ্রামের এক হাজারের বেশি বসতভিটা এবং কয়েক হাজার একর আবাদি জমিরও সুরক্ষা দিচ্ছে। বাঁধ নির্মাণের পর থেকে এলাকায় বড় ধরনের নদীভাঙন হয়নি। বাঁধটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমরা চরম ক্ষতির মুখে পড়ব।”
স্থানীয়রা জানান, একই স্থানে গত বছরও ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছিল। সে সময় বাঁধের বিপুল পরিমাণ সিসি ব্লক নদীতে ধসে পড়ে এবং প্রায় ৮০ ফুট এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁশের পাইলিং নির্মাণ করে সাময়িকভাবে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করে।
তবে স্থায়ী কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। ফলে চলতি বছর তিস্তার পানির চাপ ও তীব্র স্রোতে সেই বাঁশের পাইলিং ভেঙে গিয়ে আবারও বাঁধে ভাঙন শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, গত বছরের ক্ষয়ক্ষতির পর স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হলে এবার এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না।
গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, “গত বছর ভাঙনের পর আমরা এলজিইডিকে ব্লক ফেলে স্থায়ীভাবে ভাঙন প্রতিরোধের পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা স্থায়ী কাজ না করে বাঁশের পাইলিং করে দায় সেরেছিল। এখন সেই পাইলিংও পানির স্রোতের সামনে টিকতে পারছে না। পাইলিং ভেঙে যাওয়ায় নদীর স্রোত সরাসরি বাঁধে আঘাত করছে এবং সিসি ব্লক ধসে যাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পুরো সুরক্ষা বাঁধ ধসে যেতে পারে। তখন তিস্তা সড়ক সেতু ও মহিপুর-কাকিনা আঞ্চলিক সড়ক অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।”
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, “গত বছর ভাঙনের সময় আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিলাম এবং স্থায়ী সমাধানের জন্য এলজিইডিকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। মহিপুর সেতু এলাকায় তিস্তার স্রোত তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এখানে শুধু বাঁশের পাইলিং দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হয় না।”
তিনি বলেন, “সুরক্ষা বাঁধটি এলজিইডির আওতাধীন হওয়ায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা তাদেরই নিতে হবে। তবে কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন হলে পানি উন্নয়ন বোর্ড তা দিতে প্রস্তুত রয়েছে।”
গঙ্গাচড়া উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী শাহ মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, “গত বছর ঢাকার বিশেষজ্ঞ দলের সুপারিশ অনুযায়ী বাঁশের পাইলিং করা হয়েছিল। নতুন করে ভাঙনের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আমি নিজেও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। পানির তীব্র স্রোতের কারণে সিসি ব্লক ধসে যাচ্ছে। বাঁধ রক্ষায় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।”
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার বলেন, “আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। সুরক্ষা বাঁধটি রক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।”
গঙ্গাচড়া উপজেলায় মহিপুরে তিস্তা নদীর ওপর তিস্তা সড়ক সেতুটি রংপুরের সঙ্গে লালমনিরহাটের জেলার যোগাযোগ মাধ্যম। প্রতিদিন শত শত যানবাহন এবং হাজারো মানুষ এই সড়ক ব্যবহার করেন। ফলে সুরক্ষা বাঁধের ভাঙন অব্যাহত থাকলে শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থাই নয়, স্থানীয় অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন ও জননিরাপত্তাও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের দাবি, সাময়িক নয়, বরং নদীর গতিপ্রকৃতি ও স্রোতের তীব্রতা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত স্থায়ী নদীশাসন ও টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে প্রতি বছর একই ধরনের সংকটের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.