মেট্রোরেলের নির্মাণ ব্যয়: একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা-অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান -ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-
যানজটের নগরী ঢাকায় গণপরিবহনে স্বস্তি আনতে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের কাজ আবার শুরু হচ্ছে। সরকার কর্তৃক জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সংশোধিত ব্যয়ে অনুমোদন পেয়েছে ‘এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট)’ প্রকল্প। এই নতুন প্রকল্পের নির্মাণব্যয় এবং এর আগে চালু হওয়া দেশের প্রথম মেট্রোরেল ‘এমআরটি লাইন-৬’ এর খরচকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও গণমাধ্যমে (নির্মাণ ব্যয় নিয়ে) নতুন করে নানামুখী পর্যালোচনা শুরু হয়েছে।
নতুন মেট্রোরেলের (এমআরটি লাইন-৫: সাউদার্ন রুট) গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই লাইনের প্রস্তাবিত ব্যয় প্রথমে ধরা হয়েছিল ৫৪,৬১৮ কোটি টাকা। তবে বর্তমান সরকারের আর্থিক সাশ্রয় নীতি ও প্রকল্প পর্যালোচনার পর বাহুল্য পরিহার করে এর ব্যয় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৪৫,৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিলোমিটার প্রতি গড় ব্যয় প্রায় ২,৬৪০ কোটি টাকা (মার্কিন ডলারে যা প্রায় ২২০-২৩০ মিলিয়ন ডলার)। এই রুটের একটি অংশ মাটির নিচে (পাতালপথ), যার নির্মাণ প্রযুক্তি অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল। এছাড়া জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন খাতেই ৪,৭১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ঢাকার প্রথম চালু হওয়া উত্তরা-মতিঝিল-কমলাপুর মেট্রোরেল (এমআরটি লাইন-৬) সম্পূর্ণ উড়ালপথ হওয়া সত্ত্বেও এর নির্মাণব্যয় সমসাময়িক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বেশ উচ্চ ছিল বলেই বেশ সমালোচনা হয়েছিল। শুরুতে এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তীতে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি, স্টেশন প্লাজা নির্মাণ ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে দুই দফায় ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৩৩,৪৭২ কোটি টাকা।কিলোমিটার প্রতি গড় ব্যয় হয়েছে প্রায় ১,৫৮৪ কোটি টাকা ।
নির্মাণব্যয়ের যৌক্তিকতা বুঝতে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতার মেট্রো রেলের খরচের সাথে ঢাকার প্রকল্পের তুলনা করলে একটি বড় ব্যবধান স্পষ্ট হয়:
মেট্রো প্রকল্প ও ধরন
কিলোমিটার প্রতি খরচ (স্থানীয় মুদ্রা)
কিলোমিটার প্রতি খরচ (মার্কিন ডলারে)
ঢাকা এমআরটি-৫ (সাউদার্ন - পাতাল ও উড়াল)
প্রায় ২,৬৪০ কোটি টাকা
২২০ - ২৩০ মিলিয়ন
ঢাকা এমআরটি-৬ (প্রথম মেট্রো - সম্পূর্ণ উড়াল)
প্রায় ১,৫৮৪ কোটি টাকা
১৩০ - ১৪০ মিলিয়ন
কলকাতা গ্রিন লাইন (জটিল পাতাল ও নদীর তলদেশ)
প্রায় ১,০৩৪ কোটি রুপি
$১২৩.৫ মিলিয়ন
কলকাতা ও ভারতের অন্যান্য সাধারণ উড়াল পথ
প্রায় ২৫০-৩০০ কোটি রুপি
৩০ - ৩৬ মিলিয়ন
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, কলকাতার ইতিহাসের সবচেয়ে জটিল ও ভারতের প্রথম নদীর তলদেশ দিয়ে যাওয়া পাতাল রেলের কিলোমিটার প্রতি খরচ (১২৩.৫ মিলিয়ন ডলার), ঢাকার প্রথম নির্মিত সম্পূর্ণ সাধারণ উড়ালপথের খরচের (এমআরটি-৬) প্রায় সমান। আর ঢাকার নতুন প্রস্তাবিত রেলের খরচ কলকাতার পাতাল রেলের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।
এমআরটি লাইন-৬ উদ্বোধনের সময় এবং এর পরবর্তী সময়ে তৎকালীন বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা এই মেগা প্রকল্পের ব্যয় ও কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনা করেছিলেন। তাদের মূল অভিযোগগুলো ছিল নিম্নরূপ:
• প্রকল্পটিতে ব্যাপক অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্য হয়েছে। ইচ্ছে করে দফায় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়িয়ে জনগণের অর্থ অপচয় করা হয়েছে।
• ভারত, পাকিস্তান কিংবা ভিয়েতনামের সমসাময়িক মেট্রো প্রকল্পের তুলনায় বাংলাদেশে প্রতি কিলোমিটারে কয়েকগুণ বেশি খরচ দেখানো হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিকে ঋণের ঝুঁকিতে ফেলছে।
• অতিরিক্ত নির্মাণব্যয় উসুল করতে ঢাকার মেট্রোর ভাড়া (সর্বনিম্ন ২০ টাকা, সর্বোচ্চ ১০০ টাকা) কলকাতা, দিল্লি বা লাহোরের তুলনায় ২ থেকে ৫ গুণ বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে এটি সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের গণপরিবহন না হয়ে একটি বিলাসী মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, মেগা প্রকল্পের অবকাঠামোগত জটিলতা, ঘনবসতিপূর্ণ শহরে জমি অধিগ্রহণের চড়া মূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মুদ্রাস্ফীতিকে ব্যয়ের পক্ষে যুক্তি হিসেবে দেখানো হলেও, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় ঢাকার মেট্রোরেল নির্মাণে খরচ বরাবরই ঊর্ধ্বমুখী। বাহুল্য পরিহার করে এমআরটি-৫ এর ব্যয় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা কমানো আপাতত একটি ( জনতুষ্টিকর ) ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও, বাংলাদেশে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যয়ের অভিজ্ঞতায় নিশ্চিত করে বলা যায় এই ব্যয় আরও বাড়বে। ভবিষ্যতে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কিলোমিটার প্রতি খরচ আরও কমিয়ে আনার (অন্তত আর বাড়তে না দেয়ার) চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.