ব্রহ্মপুত্রপাড়ে সঙ্কটে জেলেরা, সঙ্কটে নৌকার কারিগররা
অনেক কারিগর পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে সারি সারি কাঠের নৌকা এখন আর আগের মতো নদের বুকে ছুটে চলে না। অনেক নৌকা মাসের পর মাস নদের পাড়ে বাঁধা পড়ে আছে। জেলেদের হাতে ছেঁড়া জাল, কিন্তু সেটিও মেরামত করতে হচ্ছে ধারদেনা করে। নৌকা মেরামতের সামর্থ্য না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় মাছ ধরছেন, আবার অনেকে চিরতরে ছেড়ে দিচ্ছেন পৈতৃক পেশা। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নৌকা তৈরির কারিগরদের জীবনেও। জেলেদের কাজ কমে যাওয়ায় তারাও হারাচ্ছেন কর্মসংস্থান।
কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র নদকেন্দ্রিক প্রায় ৩০ হাজার জেলে পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে। নদের পাড়ে রয়েছে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার মাছ ধরার নৌকা। সাধারণত তিন থেকে পাঁচজন জেলে একটি নৌকায় করে নদে মাছ ধরতে যান। এসব নৌকার দৈর্ঘ্য ৪০ থেকে ৮০ ফুট পর্যন্ত।
চিলমারী উপজেলার জোরগাছ জেলেপাড়ার জেলে সুধান চন্দ্র দাস (৫৫) দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, একসময় তার ৭০ ফুট লম্বা নৌকাটি ছিল সংসারের সবচেয়ে বড় সম্পদ। চারজন মিলে সেই নৌকায় মাছ ধরে ভালোই চলত পরিবার। কিন্তু এখন ব্রহ্মপুত্রে মাছ নেই বললেই চলে।
স্থানীয়দের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে কোনোভাবে ছেঁড়া জালটি মেরামত করেছেন। কিন্তু নড়বড়ে হয়ে পড়া নৌকাটি আর ঠিক করতে পারেননি।
"নৌকাটা এখনই মেরামত করা দরকার। কিন্তু টাকা নেই। বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়েই নদে নামতে হচ্ছে। আমাদের গ্রামের অনেকেই মাছ ধরা ছেড়ে অন্য কাজ করছেন। আমিও হয়তো বেশিদিন এই পেশায় থাকতে পারব না," বলেন তিনি।
একই গ্রামের জেলে জোনাকু দাস (৬০) জানান, আগের মতো মাছ না পাওয়ায় তার নৌকাটি দীর্ঘদিন ধরে নদের তীরে বাঁধা রয়েছে। দলের আরও চারজন সদস্যকে নিয়ে এখন তিনি স্থানীয় খাল-বিলে মাছ ধরেন।
তিনি বলেন, "একটি নৌকা বানাতে ৫০ থেকে ৯০ হাজার টাকা লাগে। প্রতিবছর মেরামতেই খরচ হয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু সেই টাকা তোলার মতো আয় নেই। তাই দুই বছর ধরে নৌকাটি মেরামতই করতে পারিনি।"
জেলেদের এই দুর্দশার প্রভাব পড়েছে নৌকা তৈরির ঐতিহ্যবাহী পেশাতেও। অনেক নৌকা তিরর কারিগর কোনরকমে তাদের পেশাকে টিকিয়ে রাখলেও অনেকে এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। নৌকা কারগিরদের জীবিকাও সঙ্কটে পড়েছে।
নৌকার কারিগররা জানান, কয়েকবছর আগে প্রত্যেক নৌকার কারিগর সারাবছর নৌকা তৈরি ও মেরামত করে ৫-৬ লাখ টাকা উপার্জন করতেন। এখন সারা বছরজুড়ে এক লাখ টাকাও উপার্জন করতে পারছেন না। দিনদিন তাদের উপার্জন আরো কমছে।
জোরগাছ এলাকার নৌকার কারিগর জাবেদ আলী (৫৫) প্রায় ৩৫ বছর ধরে নৌকা তৈরি ও মেরামতের কাজ করছেন। তিনি জানান, চার-পাঁচ বছর আগেও বছরে অন্তত চারটি নতুন নৌকা তৈরি করতেন এবং ২০ থেকে ২৫টি নৌকা মেরামতের কাজ পেতেন। এখন পুরো বছরে একটি নতুন নৌকার অর্ডারও পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। মেরামতের কাজও নেমে এসেছে মাত্র চার-পাঁচটিতে।
তিনি বলেন, "আগে সারাবছর কাজের চাপ থাকত। এখন বসেই থাকতে হয়। আমাদের দলের একজন সদস্য মনিরুল ইসলাম কাজ না পেয়ে ইজিবাইক চালানো শুরু করেছেন। অনেক জেলে অর্থাভাবে নৌকা মেরামত করতে পারছেন না। কেউ কেউ নৌকা নদের পাড়েই ফেলে রেখেছেন।"
উলিপুর উপজেলার হাতিয়া জেলেপাড়ার জেলে রনজিত চন্দ্র বিশ্বাস (৬৫) গত বছর মাছ ধরা ছেড়ে ইজিবাইক চালানো শুরু করেছেন।
তার ভাষায়, "নদে একদিন মাছ ধরতে গেলে নৌকা, শ্যালো মেশিন আর ডিজেলের খরচই উঠে না। মাছ বিক্রি করে সেই টাকা ফেরত আসে না। আবার মাছ ধরতে নামতে হলে প্রতিবছর জাল-নৌকা মেরামতে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা লাগবে। এত টাকা আমার নেই। তাই নৌকাটা বাড়ির পাশে নদের তীরে বেঁধে রেখেছি।"
তবে এখনও পৈতৃক পেশা আঁকড়ে ধরে আছেন একই গ্রামের সুবাস চন্দ্র দাস (৫৫)। তিনি জানান, পাঁচজনের দল নিয়ে একদিন ব্রহ্মপুত্রে, আরেকদিন স্থানীয় খাল-বিলে মাছ ধরেন।
"একসময় নৌকা মেরামতের জন্য কারিগরদের কাছে অপেক্ষা করতে হতো। এখন উল্টো কারিগররা কাজের অপেক্ষায় থাকেন। আমার নৌকাটিও মেরামত করা জরুরি, কিন্তু টাকার অভাবে পারছি না। আগামী বছর মেরামত না করলে হয়তো আর নদে নৌকাটি নামানো যাবে না," বলেন তিনি।
হাতিয়া এলাকার নৌকার কারিগর যতিন চন্দ্র সরকার (৬০) বলেন, একসময় ব্রহ্মপুত্রপাড়ে নৌকার কারিগরদের আলাদা কদর ছিল। বছরের অধিকাংশ সময়ই তারা ব্যস্ত থাকতেন। এখন কাজ না থাকায় দিনের পর দিন অলস বসে থাকতে হয়।
"নদে আগের মতো মাছ না থাকায় জেলেরা বিপদে পড়েছেন। আর জেলেদের এই দুর্দশা আমাদেরও পথে বসিয়েছে। নদে যদি আবার মাছ ফিরত, তাহলে জেলেদের পাশাপাশি আমাদের কর্মচাঞ্চল্যও ফিরে আসত," বলেন তিনি।
কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম আকন্দ জানান, বিভিন্ন কারণে ব্রহ্মপুত্রে দেশীয় মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, নিষিদ্ধ জালে পোনা মাছ ধরা, মা মাছ নিধন এবং চরাঞ্চলে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন এর অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, "দেশীয় মাছের প্রজনন রক্ষা এবং মা ও পোনা মাছ শিকার বন্ধে জেলেদের সচেতন করা হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রে আবার পর্যাপ্ত মাছ ফিরলে শুধু জেলেরাই নয়, নৌকার কারিগর, মাছ ব্যবসায়ীসহ পুরো নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি সচল হবে। একই সঙ্গে ভোক্তারাও দেশীয় প্রজাতির পুষ্টিকর মাছ পাবেন।"
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.