ব্রহ্মপুত্রপাড়ের জীবন
নদীভাঙনে সব হারিয়ে চাষি থেকে বর্গাচাষি হয়েছেন খতিব
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
বয়সের ভারে নুয়ে পড়া কৃষক খতিব উদ্দিন মন্ডল (৭৩) এখন আর আগের মতো মানুষের সঙ্গে গল্প করেন না। মুখের চিরচেনা হাসিটাও যেন বহু আগেই হারিয়ে গেছে। চোখজুড়ে জমে আছে দীর্ঘশ্বাস আর বেদনার ছাপ। প্রায়ই তিনি একা একা গিয়ে বসেন ব্রহ্মপুত্রের তীরে। নীরবে তাকিয়ে থাকেন উত্তাল নদীর দিকে—যেখানে একসময় ছিল তার স্বপ্নের বাড়ি, পৈতৃক ভিটা আর ফসলের সবুজ মাঠ। সেই দিকে চোখ পড়লেই অজান্তে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। চার বছর পেরিয়ে গেলেও নদীর গর্ভে হারিয়ে যাওয়া জীবনটাকে আজও ভুলতে পারেননি তিনি।
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রানীগঞ্জ ইউনিয়নের সড়কটারী এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের ডান তীরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধসংলগ্ন খাসজমিতে একটি ছোট্ট ঘর তুলে এখন বসবাস করছেন খতিব উদ্দিন মন্ডল। পাশে আছেন তার জীবনসঙ্গী সখিনা বেগম (৬৮)। দুই ছেলে জীবিকার তাগিদে ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করেন। আর খতিব এখনও পড়ে আছেন জন্মস্থানে। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে জমিতে ফসল ফলান জীবিকা নির্ভর করতে। কৃষিকাজই তার জীবন, তার পরিচয়, তার অস্তিত্ব।
একসময় তার ছিল ১৬ বিঘা উর্বর আবাদি জমি এবং ১২ শতাংশের বসতভিটা। বাড়ির চারপাশে ছিল আম, কাঁঠাল, লিচুসহ নানা ফলের গাছ। বছরের প্রায় সব সময়ই মাঠে কোনো না কোনো ফসল থাকত। কৃষিকাজ করেই সচ্ছল সংসার চলত। কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের ভয়াল ভাঙন একে একে কেড়ে নিয়েছে সব—জমি, বসতভিটা, গাছপালা, স্মৃতি, এমনকি স্বপ্নও।
তবু জন্মভূমি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে মন সায় দেয়নি তার। তাই স্ত্রীকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন খাসজমিতে। নিজের জমি নেই, কিন্তু কৃষিকাজ ছাড়েননি। এখন অন্যের জমি বর্গা নিয়ে ধানসহ বিভিন্ন ফসল ফলিয়েই কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন।
শনিবার দুপুরে দেখা যায়, বাঁধের ওপর স্ত্রী সখিনা বেগমকে সঙ্গে নিয়ে বর্গা চাষের জমিতে উৎপাদিত ধান শুকিয়ে হাঁড়িতে ভরে সংরক্ষণ করছেন। সেটুকুই তাদের আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তার ভরসা। সেখানেই কথা হয় খতিব উদ্দিন মন্ডলের সঙ্গে।
তিনি জানান, একসময় ব্রহ্মপুত্রের বয়ে আনা পলিমাটি তার জমিগুলোকে অত্যন্ত উর্বর করে তুলত। ধান, ভুট্টা, পাট, সরিষাসহ নানা ফসলে মাঠ ভরে থাকত। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে সারাবছরই কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকতেন। সংসারে কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু নদীভাঙন তাদের জীবন থেকে সেই স্বচ্ছলতা চিরতরে কেড়ে নিয়েছে।
চোখ মুছতে মুছতে তিনি বলেন, “ব্রহ্মপুত্র হামাকগুলাক শ্যাষ করি ফ্যালাইছে বাহে। হামাকগুলাক ভূমিহীন করি দিছে। এ্যালা এ্যাকনা টুকরাও জমি নাই। খাসের জমিত ঘর তুলি থাইকবার নাইকছি। হামরা ধ্বংস হয়া গেছি।”
খতিব উদ্দিন বলেন, ছোটবেলা থেকেই কৃষিকাজ তার নেশা ও পেশা। বয়সের কারণে এখন আর দিনমজুরের মতো ভারী শ্রম দেওয়ার শক্তি নেই। তাই অন্যের দুই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে দিনভর মাঠে কাজ করেন। ভাগে যে ফসল পান, তা দিয়েই কোনো রকমে সংসার চলে।
তিনি বলেন, বর্গাচাষে লাভ বলতে তেমন কিছুই থাকে না। তবু কৃষিকাজ ছেড়ে থাকতে পারেন না।
“বাবার রাখি যাওয়া জমিগুলা যত্তে থুছিলং, কিন্তু ব্রহ্মপুত্র সোগে কাড়ি নিছে। মোর ব্যাটাগুলা ঢাকাত যেয়া কামলা দিবার নাইকছে। হামারগুলার কষ্টের শ্যাষ নাই বাবা,”—কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে।
পাশে বসে থাকা স্ত্রী সখিনা বেগম স্মৃতিচারণ করে বলেন, মাত্র ১৬ বছর বয়সে এই বাড়িতে বধূ হয়ে এসেছিলেন। তখন তাদের সংসার ছিল স্বচ্ছল। জমি ছিল, ফসল ছিল, ঘরে অভাব ছিল না। অথচ জীবনের শেষ প্রান্তে এসে স্বামীকে নিয়ে খাসজমিতে আশ্রয় নিতে হয়েছে।
তিনি বলেন, এখন অনেক দিন ভাত জোটে, কিন্তু তরকারি জোটে না। প্রতিটি দিনই সংগ্রামের। বয়সের ভারে স্বামীর শরীরে আর আগের শক্তি নেই। তবুও শুধুমাত্র মনের জোরে তিনি মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন।
সখিনা বলেন, একসময় গ্রামের সবাই তার স্বামীকে সম্মান করে শুধু ‘মন্ডল’ বলেই ডাকতেন। এখন সেই মানুষটিই যেন নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন। নদীভাঙনে গ্রামের অধিকাংশ পরিবার জমি ও বসতভিটা হারিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। যারা রয়ে গেছেন, তাদের বেশির ভাগই এখন ভূমিহীন।
তিনি বলেন, “গেল চার বছর থাকি যে কষ্ট কইরবার নাইকছি তাক ভাষায় প্রকাশ কওয়ার মতোন নোয়ায়। শেষ জীবনের কষ্টটা বারবার কাঁনবার নাইকছে। জানিনা আল্লাহ হামারগুলার কপালোত আর কি লিখি থুইছে।”
রানীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনজুরুল ইসলাম বলেন, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন শুধু একটি পরিবারের জমি বা ঘরবাড়িই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে তাদের সামাজিক মর্যাদা, নিরাপত্তা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন এবং আজীবনের সঞ্চয়। খতিব উদ্দিন মন্ডলের মতো শত শত কৃষক আজ নিজ জমির মালিক থেকে বর্গাচাষিতে পরিণত হয়েছেন। নদীর ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করতে করতে তাদের জীবন এখন টিকে থাকার এক অনন্ত সংগ্রামের নাম। ব্রহ্মপুত্রপাড়ে প্রত্যেক পরিবারে রয়েছে সংগ্রামের গল্প।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.