ফারাহ মাহবুব ১৯৯২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা আদালতের একজন উকিল হিসাবে বার কাউন্সিল এ তালিকাভুক্ত হন। জেলা আদালতে তার সাফল্যের পর, তিনি ১৯৯৪ সালের ৯ এপ্রিল এবং ২০০২ সালের ১৫ মে যথাক্রমে হাইকোর্ট বিভাগ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে তালিকাভূক্ত হন। তিনি ২০০৪ সালের ৮ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান এবং ২০০৬ সালের ২৩ আগস্ট একই বিভাগের বিচারক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তিনি ২০৩৩ সালের ২৬শে মে অবসর গ্রহণ করবেন।
তিনি ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জার্মানি এবং সৌদি আরব সহ অনেক দেশ সফর করেন।
২১ জানুয়ারি ২০২৬, বিচারপতি ফারাহ মাহবুবকে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস কমিশনের (বিজেএসসি) চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।তিনি এই কমিশনের সর্বপ্রথম নারী চেয়ারম্যান।
★★ আজকে আমরা বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের একটি বিখ্যাত মামলা সংবিধানের ১৫ তম সংশোধন নিয়ে আলোচনা করব। এছাড়াও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব বিখ্যাত বিশেষ করে VAT & CUSTOMS এই বিষয় গুলোর উপর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব এর যথেষ্ট পরিমান পান্ডিত্য রেয়েছে এবং বিগত এক দশকে VAT & CUSTOMS এ সকল বিষয়ের উপরে তার অনেক উল্লেখযোগ্য রায় রয়েছে যেগুলা সব সময় আইনজীবীদের পাথেয় হিসেবে থাকবে।
বিচারপতি ফারাহ মাহবুব নিজেকে একজন দক্ষ, সৎ এবং পরিশ্রমী বিচারক হিসেবে প্রমাণ করেছেন। তাঁর সিদ্ধান্ত এবং রায়গুলো আমাদের দেশের বিভিন্ন আইন সাময়িকীতে (Law Journals) প্রকাশিত হয়েছে। রায়গুলো অত্যন্ত চমৎকার এবং আইনের বিভিন্ন বিষয়ের সঠিক ব্যাখ্যা এতে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি অত্যন্ত যত্ন ও সতর্কতার সাথে তাঁর আইনি কাজগুলো সম্পাদন করতেন। তিনি ছিলেন একজন অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং তরুণ ও বয়োজ্যেষ্ঠ সকলের প্রতি তাঁর আচরণ ছিল অত্যন্ত আন্তরিক।. “The judgments are remarkable and reflected true expositions of law on various subjects. He used to perform his legal work in meticulous care and caution. He was a gentleman per excellence and his attitude towards the young and aged was extremely cordial”
আজকে আমরা ২০১১ সালের সংবিধানের ১৫ তম সংশোধন চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের এবং সেই মামলার প্রেক্ষাপট এবং ফলাফল নিয়ে আলোচনা করব। রায়টি বর্নিত হয়েছে [SCOB 20(HD)1]
রীট পিটিশন নম্বর ৯৯৩৫/২০২৪ এবং ১২৪৩১/২০২৪-এর রায়টির একটি বিস্তারিত বাংলা সারমর্ম নিচে তুলে ধরা হলো:
১. মামলার পটভূমি ও রিট পিটিশনের উদ্দেশ্য
মামলার কারণ: দেশের সচেতন নাগরিকবৃন্দ (পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন বা জনস্বার্থ মামলার অংশ হিসেবে) ২০১১ সালের সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী আইনকে (২০১১ সালের ১৪ নম্বর আইন) চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করেন।
মূল দাবি: এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে যে সমস্ত পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তা সংবিধানের মূল কাঠামোর (Basic Structure) পরিপন্থী এবং অসাংবিধানিক বলে বাতিলের দাবি জানানো হয়।
২. বিচার্য বিষয়সমূহ এবং আদালতের পর্যবেক্ষণ
লোকাস স্ট্যান্ডি (Locus Standi) বা রিট করার অধিকার: আদালত রায় দেন যে, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে এবং জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। এটি একটি বিশুদ্ধ জনস্বার্থ মামলা (Pro bono publico) হওয়ায় আবেদনকারীদের এই রিট দায়ের করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
জীবন্ত দলিল হিসেবে সংবিধান: আদালত উল্লেখ করেন, সংবিধান কোনো স্থবির বা অপরিবর্তনশীল বিষয় নয়, এটি সময়ের প্রয়োজনে পরিবর্তন ও পরিবর্ধনযোগ্য একটি "জীবন্ত অঙ্গ" (Living Organism)। তবে সংসদ চাইলেই এর মৌলিক কাঠামো বা মূল স্তম্ভসমূহ ধ্বংস করতে পারে না।
সংসদের সংশোধনী ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা: সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের সংবিধান সংশোধন করার ক্ষমতা থাকলেও, তা অসীম বা অনিয়ন্ত্রিত নয়। সংসদ এমন কোনো সংশোধনী আনতে পারে না যা সংবিধানের মূল কাঠামোর ক্ষতি করে কিংবা মৌলিক অধিকার বা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার (Judicial Review) ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ণ করে।
৩. রায়ের মূল সিদ্ধান্তসমূহ (বাতিল ও পুনর্বহালকৃত বিধানাবলী)
আদালত ১৫ তম সংশোধনীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা ও অনুচ্ছেদকে অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করে পূর্বের অবস্থায় পুনর্বহালের রায় দেন:
নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা (Non-Party Caretaker Government): ১৫ তম সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার ধারাকে (অনুচ্ছেদ ৫৮এ এবং অধ্যায় ২এ-এর বিলুপ্তি) আদালত অসাংবিধানিক এবং অবৈধ ঘোষণা করেন। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার স্বার্থে এই ব্যবস্থাটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচিত এবং এটি বাতিলের সিদ্ধান্ত বাতিল করে পূর্বের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হয়।
গণভোট প্রথা (Referendum): ১২তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ ৮, ৪৮ ও ৫৬ সংশোধনের ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের জন্য যে গণভোটের বিধান ছিল, তা ১৫তম সংশোধনীতে বাতিল করা হয়েছিল। আদালত এই বিলুপ্তি অবৈধ ঘোষণা করেন এবং গণভোটের পূর্বের নিয়মটি পুনরায় বহাল করেন।
অনুচ্ছেদ ৭এ এবং ৭বি (Article 7A & 7B) বাতিল: * ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে '৭এ' (রাষ্ট্রদ্রোহিতা ও অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখল) এবং '৭বি' (সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলী সংশোধন অযোগ্য করা) অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছিল।
আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, '৭এ'-এর শব্দচয়ন অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং তা বাকস্বাধীনতার অন্তরায় হতে পারে।
অন্যদিকে, '৭বি' অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ভবিষ্যতের সংসদের সংবিধান সংশোধনের অধিকারকে সম্পূর্ণভাবে খর্ব করা হয়েছিল যা অনুচ্ছেদ ১৪২-এর সাথে সাংঘর্ষিক। ফলে আদালত ৭এ এবং ৭বি দুটো অনুচ্ছেদকেই অবৈধ এবং বাতিল ঘোষণা করেন।
অনুচ্ছেদ ৪৪(২) - হাইকোর্টের ক্ষমতা রক্ষা: ১৫ তম সংশোধনীর মাধ্যমে মৌলিক অধিকার বলবৎকরণের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের একক বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতাকে অন্য কোনো সংবিধিবদ্ধ আদালতের হাতে স্থানান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছিল। আদালত এটিকে হাইকোর্টের ক্ষমতার পরিপন্থী মনে করে বাতিল করেন।
Before we part, we would like to observe that the constitutionality of the Constitution (Fifteenth Amendment) Act, 2011 (Act No. 14 of 2011) has been challenged before this Court after more than 13 (thirteen) years by the conscious citizens of the country in the nature of public interest litigation representing the citizens of the nation, the citizens who are the ultimate source of power, knocking the door of the High Court Division of the Supreme Court of Bangladesh, the protector and custodian of the Constitution of the People’s Republic of Bangladesh, to listen to their cry for establishing justice, rule of law and democracy, to eliminate the concept of authoritarianism from all spheres of lives, to allow them to express their will with exercise of their right to franchise through the process of free and fair election; to allow the new generation to exercise their right to determine the law under which they want to live with change and growth in constitutional law with new hope and with the spirit of time.
৪. রায়ের তাৎপর্য
এই রায়ের মাধ্যমে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, বাংলাদেশে সংবিধানের সর্বোচ্চতা এবং জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলনই শেষ কথা। সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এমন কোনো আইন বা সংশোধনী পাস করা সম্ভব নয় যা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, অবাধ নির্বাচন ব্যবস্থা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করে বা একনায়কতন্ত্রের পথ সুগম করে।
বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের আরও অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ রায় রয়েছে যেগুলো নিয়ে পর্যায়ক্রমে আপনাদের সামনে আলোচনা করা হবে এবং এই রায়গুলো যে কোন আইনজীবী মনোযোগ দিয়ে পড়েন তাহলে আইন বিষয়ে তার দক্ষতা আরো কয়েকগুন বেড়ে যাবে তদুপরি ভ্যাট এবং কাস্টম সহ অন্যান্য বিষয়ে তার অগাধ জ্ঞান গরিমা বৃদ্ধি পাবে। মোঃ আরিফুল ইসলাম মুরাদ সিনিয়র সাংবাদিক দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি সটাফ রিপোটার,,,,,
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
(01884-553490, 01911-206989)
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.