বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে ধনী–দরিদ্র নির্বিশেষে প্রতিটি দেশের জন্য কূটনীতি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সে কূটনীতিকে কত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারে তার ওপর। আন্তর্জাতিক ক্ষমতার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে কূটনৈতিক প্যারাডক্স একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শীতল যুদ্ধের সময় দুই পরাশক্তির মধ্যে যে বৈদেশিক নীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল, আজকের বিশ্ব বাস্তবতা তার থেকে ভিন্ন। সোভিয়েত রাশিয়ার পতন ও শীতল যুদ্ধের অবসানের পর একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থান ও প্রভাব বিস্তার ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র একক বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এবং তার প্রভাবকে কার্যকরভাবে চ্যালেঞ্জ করার মতো অবস্থানে বর্তমানে আর কোনো শক্তি নেই। যদিও রাশিয়া ও চীন বিশ্ব রাজনীতির ভারসাম্য নিজেদের অনুকূলে আনার চেষ্টা করছে, তবু তা এখনো সফল হয়নি।
বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র অনেক সময় আন্তর্জাতিক আইন ও শৃঙ্খলার সব নীতি ভেঙে নিজ হাতে আইন তুলে নেয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তাদের দেশে নিয়ে গিয়ে বিচার করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা আবারও ‘ন্যায়ের ওপর শক্তির শাসন’ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং নিজেদেরকে বিশ্বে একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে প্রমাণ করেছে। যদিও চীন ও রাশিয়ার মতো অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের এ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছে, তবু তা কোনো ফল বয়ে আনেনি।
এখন আমাদের কূটনৈতিক প্যারাডক্সের কথায় ফিরে আসি এবং দেখি—নিকট ভবিষ্যতে টেকসই শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য আমরা আমাদের বিদ্যমান সম্পদগুলো কীভাবে সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার করতে পারি। বর্তমান বাস্তবতায় আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে উপেক্ষা করতে পারি না এবং আমাদের জানা সুস্পষ্ট কারণেই তাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা ছাড়া বিকল্প নেই।
অনেক গবেষক চীনের সঙ্গে শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার পক্ষে মত দেন। তারা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করার এবং পাকিস্তানের কৌশল অনুসরণের পরামর্শও দেন। তবে পাকিস্তানের জন্য যা কার্যকর, তা আমাদের জন্য নাও হতে পারে। পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চীনের সহায়তায় প্রমাণিতভাবে বেশ স্বনির্ভর, অথচ আমাদের বর্তমান নিরাপত্তা কৌশলে সেই সক্ষমতার মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। শেখ হাসিনার শেষ ফ্যাসিস্ট শাসনামলে আমাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী প্রতিবেশী কোনো দেশের সঙ্গে যুদ্ধ করার সক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলেছে।
কেন এমন হয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর অমূল্য হলেও বাস্তব সত্য হলো, এতে কোনো সন্দেহ নেই। পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি গত পনেরো বছরে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নির্বিচার দুর্নীতিতে প্রলুব্ধ করা হয়েছে। ফলে বাহিনী তার পেশাদারিত্ব হারিয়ে কার্যত একটি দলীয় বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নির্দেশ মানতে বাধ্য করা হয়েছে সশস্ত্র বাহিনীকে, যার ফলে তারা নিজেদের স্বাধীনতাও হারিয়েছে।
এ অবস্থায় নিরাপত্তা ও উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে আনা যায়—এই প্রশ্ন সামনে আসে এবং কূটনীতিকে সে অনুযায়ী পেশাদার পরিপক্বতা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে কাজ করতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বেসামরিক প্রশাসন সমাজের ওপর তাদের প্রভাব হারিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ তাদের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস দুটোই হারিয়েছে এবং তারা বেসামরিক, সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে মৌলিক পরিবর্তন দেখতে চায়। কিন্তু মূল্যবান সময় নষ্ট না করে কীভাবে তা করা যায়—এটাই এখন আমাদের প্রধান উদ্বেগ।
আমার যুক্তি হলো, আর সময় নষ্ট না করে অবিলম্বে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করা উচিত এবং তা এখনই কার্যকর করা দরকার। এটা নিশ্চিত যে ভারত আমাদের ছেড়ে দেবে না। কেবল পাকিস্তানের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্কই কার্যকর প্রতিরোধ (ডিটারেন্স) সৃষ্টি করতে পারে। তাই পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়ন এখন জরুরি প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। “পূর্বের প্রতিরক্ষা পশ্চিমের সঙ্গে”—এই ধারণাটি এখনো কার্যকর হতে পারে।
পরবর্তী বিষয়টি হলো উন্নয়ন, যা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সহায়তায় সম্পন্ন করা উচিত। যুক্তরাষ্ট্র এতে আপত্তি করবে না যদি আমরা চীনকে উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করি এবং তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখি। কাজটি কঠিন, কিন্তু যে কোনো মূল্যে তা করতে হবে। কূটনীতিতে বুদ্ধিদীপ্ত ও কার্যকর পন্থা থাকতে হবে। পেশাদার পরিপক্বতা ও প্রকৃত কূটনৈতিক রীতিনীতির মধ্য দিয়ে এটি বিকশিত হতে হবে এবং জাতির টেকসই শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনে যে কোনো উপায় অবলম্বন করা যেতে পারে।
দুটি দেশের মধ্যে সর্বোত্তম ও টেকসই কূটনীতি তখনই বেশি কার্যকর হয়, যখন উভয় দেশের জনগণ পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে একইভাবে চিন্তা করে। জনগণ থেকে জনগণের সম্পর্ক গড়ে তোলাই এখানে মুখ্য, যা নির্ভর করবে উভয় দেশের মানুষের আন্তরিকতার ওপর—তারা একে অপরের প্রকৃত ভাই-বোন হতে কতটা প্রস্তুত।
এটি সম্ভব ব্যবসা, খেলাধুলা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে। শিক্ষা ও সংস্কৃতি অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের যুবসমাজের মধ্যে স্থায়ী বন্ধন সৃষ্টি করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমান হিসেবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান একটি অভিন্ন ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করে। তারা দক্ষিণ এশিয়ায় সাতশ বছরের মুসলিম শাসনের গৌরবময় ইতিহাসের অংশীদার। মুসলমান হিসেবে উভয় দেশের মানুষের মধ্যে বহু সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের মিল রয়েছে। ধর্মীয় বন্ধন স্থায়ী—রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দিয়ে তা মুছে ফেলা যায় না। একই ঐতিহাসিক পটভূমির মুসলমান হিসেবে তারা নতুন পরিবেশে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সাম্প্রতিক জুলাই বিপ্লবের পর পরিস্থিতি আমাদের ইতিহাসের যে কোনো সময়ের তুলনায় আরও কাছাকাছি এনে দিয়েছে। পাকিস্তান বাংলাদেশ সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে আন্তরিক বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ভবিষ্যতে যে কোনো সংকটে তারা বাংলাদেশকে সব ধরনের সামরিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত। এটাই হলো—“প্রয়োজনে বন্ধু মানেই প্রকৃত বন্ধু”। আমাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়।
অতীতের ভুল বোঝাবুঝি ভুলে আমাদের নতুন বন্ধুত্বের যাত্রা সফল করতে হবে। গত পঞ্চান্ন বছর ধরে ভারত নোংরা রাজনীতি করে পাকিস্তানকে বাংলাদেশের কাছ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছে। সাফল্য অর্জনের জন্য আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং সমাজের সংশ্লিষ্ট সবাইকে এটিকে একটি মিশনারি দায়িত্ব হিসেবে নিতে হবে।
যদি আমরা বাংলাদেশকে ভারতীয় আধিপত্যবাদী নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত দেখতে চাই, তবে পাকিস্তানের সঙ্গে হাত মেলানো ছাড়া বিকল্প নেই। ১৯৭১ সালের অবাস্তব আবেগ ভুলে আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা যে সুযোগ আমাদের দিয়েছেন, তা কাজে লাগিয়ে আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।
শত্রুর শত্রুই আমাদের শ্রেষ্ঠ বন্ধু—এটাই বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্যারাডক্স হওয়া উচিত।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহকারী সম্পাদক : মোঃ ছাব্বির হোসেন
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
নির্বাহী সম্পাদক : মেছবাহ উদ্দিন (01884-553490, 01911-206989)
বার্তা সম্পাদক : মোঃ বদিয়ার মুন্সী
মফাস্বল সম্পাদক: মাহবুবুর রহমান।
সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদকঃ আসাদুজ্জামান খান মুকুল
www.dainikbanglarsangbad.com
ইমেইলঃ dainikbanglarsangbad490@gmail.com
প্রধান কার্যলয়ঃ ৩৬০/১,২তলা ভিটিবির নিকটে,
ডি আইটি রোড রামপুরা ঢাকা।
মোবাইলঃ01736-091515, 01716-698621
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Copyright © 2026 dainikbanglarsangbad.com. All rights reserved.