পারভীন ম্যাডাম—
মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের পারভীন ম্যাডাম
শাসনের আড়ালে যে মমতা ছিল
মোঃ আরিফুল ইসলাম মুরাদ সিনিয়র সাংবাদিক স্টাফ স্টাফ দৈনিক বাংলার স্ংবাদ,,
জীবনে কিছু মানুষকে কখনো ভোলা যায় না। সময় তাদের আমাদের কাছ থেকে অনেক দূরে নিয়ে যায়, চেহারায় বয়সের ছাপ পড়ে, চুলে পাক ধরে—কিন্তু স্মৃতির পাতায় তারা ঠিক আগের মতোই থেকে যান।
আমার জীবনে তেমনই একজন মানুষ—পারভীন ম্যাডাম।
শুধু আমার নয়, আমার বিশ্বাস, মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর হৃদয়ে পারভীন ম্যাডামের জন্য আলাদা একটা জায়গা ছিল।
ম্যাডাম ছিলেন অদ্ভুত এক মানুষ।
একদিকে কঠোর শাসন, অন্যদিকে মায়ের মতো মমতা।
ক্লাসে পড়া না পারলে শাসন করতেন, ভুল করলে বকতেন, দুষ্টুমি করলে চোখ রাঙাতেন। তখন মনে হতো—“ইশ! ম্যাডাম এত বকেন কেন?”
কিন্তু আজ এত বছর পর বুঝি, সেই বকুনির প্রতিটি শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল আমাদের জন্য ভালোবাসা।
আমাদের কে কেমন—সেটা ম্যাডাম শুধু পরীক্ষার খাতা দেখে বুঝতেন না। তিনি আমাদের জীবনটাকেও বুঝতে চেষ্টা করতেন।
কার বাড়ি কোথায়, কার বাবা কী করেন, কার পরিবারে কী অবস্থা—এসব জানার চেষ্টা করতেন। আমরা তখন হয়তো বুঝতাম না, একজন শিক্ষক কেন এত কিছু জানতে চান।
আজ বুঝি—
তিনি শুধু আমাদের পড়াতেন না, আমাদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাইতেন।
আমার নিজের জীবনের একটি ঘটনা আজও খুব মনে পড়ে।
একদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে নাস্তা না করে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, বিষয়টা কেউ বুঝবে না।
কিন্তু পারভীন ম্যাডামের চোখ এড়িয়ে কিছু যেত না!
ক্লাসের মাঝেই ম্যাডাম বুঝে ফেললেন। তারপর ক্লাস ক্যাপ্টেনকে দিয়ে কলা আনিয়ে আমার হাতে দিয়ে বললেন—
“নেও, খাও।”
সেই মুহূর্তে হয়তো ব্যাপারটা আমার কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। কিন্তু আজ ভাবি, একজন শিক্ষক কতটা আপন হলে ছাত্রের সকালের নাস্তা হয়েছে কি না—সেটাও বুঝতে পারেন!
সেই কলার সঙ্গে যে মায়ের মতো মমতা মিশে ছিল, সেটি আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন।
এমন অসংখ্য ঘটনা হয়তো আমাদের প্রত্যেকের জীবনে আছে।
কেউ হয়তো ম্যাডামের বকুনি খেয়েছে।
কেউ হয়তো পরীক্ষার আগে বিশেষ পরামর্শ পেয়েছে।
কেউ হয়তো ভুল করার পর ম্যাডামের কাছ থেকে কঠিন কথা শুনেছে।
আবার সেই কঠিন কথার পরই হয়তো পেয়েছে সবচেয়ে সুন্দর একটি পরামর্শ।
তখন আমরা ভাবতাম—ম্যাডাম খুব কড়া।
আজ মনে হয়—
আমাদের জীবনে এমন কড়া একজন মানুষ থাকা আসলে ছিল বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার।
বছর কেটে গেছে। মোহনগঞ্জ পাইলট স্কুলের সেই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আজ কেউ বাবা, কেউ মা। কেউ চাকরি করছে, কেউ ব্যবসা করছে, কেউ দেশের বাইরে। কারও মাথায় চুল কমেছে, কারও চুলে পাক ধরেছে।
আর আমাদের সেই পারভীন ম্যাডামও নিশ্চয়ই সময়ের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছেন।
তবুও তাঁর স্মৃতিতে আমরা এখনো সেই আগের মতোই।
ম্যাডাম আমাকে মেসেজে লিখেছেন—
“সেই চটপটে পিচ্চি আনিছ এখন সন্তানের বাবা। অভিনয় করতে দারুণ। ভুল বলেছি কি?”
মেসেজটা পড়ে হেসেছি।
কিন্তু হাসির আড়ালে কখন যে চোখের কোণে পানি চলে এসেছে, নিজেও বুঝিনি।
কারণ বুঝতে পেরেছি—
আমরা বড় হয়ে গেলেও আমাদের শিক্ষকদের কাছে আমরা কখনো পুরোপুরি বড় হই না।
আমরা তাদের কাছে সেই স্কুলের ইউনিফর্ম পরা ছেলেমেয়েই থেকে যাই।
ম্যাডাম আরও লিখেছেন, তিনি ফেসবুকে মোহনগঞ্জ স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের দেখলে স্মৃতির অতল গহ্বরে হারিয়ে যান।
আসলে শুধু ম্যাডামই হারিয়ে যান না—আমরাও হারিয়ে যাই।
কখনো সেই স্কুলের বারান্দায়,
কখনো ক্লাসরুমের বেঞ্চে,
কখনো টিফিনের ঘণ্টায়,
কখনো বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায়,
আর কখনো পারভীন ম্যাডামের সেই কঠিন অথচ মায়ামাখা কণ্ঠে—
“পড়া শিখেছ?”
আজ মনে হয়, স্কুলের দিনগুলো আসলে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন ছিল।
তখন আমাদের কাছে ম্যাডামের শাসন ছিল বিরক্তিকর।
আজ সেই শাসনই স্মৃতি।
তখন বকুনি শুনে মন খারাপ হতো।
আজ সেই বকুনিই ভালোবাসার গল্প।
তখন মনে হতো, ম্যাডাম কেন এত কঠোর?
আজ বুঝি—
যে শিক্ষক সত্যিকারের ভালোবাসেন, তিনিই প্রয়োজন হলে শাসন করতে পারেন।
পারভীন ম্যাডাম তাঁর মেসেজের শেষদিকে লিখেছেন—
“তোমাদের মতো এতো ভালো ছাত্রছাত্রী পেয়েছিলাম বলেই আজ আমি পারভীন ম্যাডাম নামে মোহনগঞ্জে এতো পরিচিতি পেয়েছি।”
কী অসাধারণ কথা!
একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রদের জন্য গর্বিত।
আর ছাত্ররা তাদের শিক্ষককে নিয়ে গর্বিত।
এটাই তো একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় অর্জন।
ম্যাডাম, আপনি হয়তো জানেন না—আপনি আমাদের কতটা প্রিয় ছিলেন।
আপনি হয়তো মনে করেন, আপনি আমাদের পড়িয়েছেন, শাসন করেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন।
কিন্তু সত্যিটা হলো—
আপনি আমাদের শৈশবের একটা অংশ হয়ে গেছেন।
আপনার দেওয়া শিক্ষা হয়তো আমরা অনেক কিছুই ভুলে গেছি।
কোন অধ্যায়, কোন সূত্র, কোন সংজ্ঞা—সব হয়তো মনে নেই।
কিন্তু আপনার মমতা ভুলিনি।
আপনার শাসন ভুলিনি।
আপনার সেই আন্তরিক চোখের দৃষ্টি ভুলিনি।
আর সবচেয়ে বড় কথা—
আপনাকে ভুলিনি।
আর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যেন আপনি গর্ব করে বলতে পারেন—
“আমি পারভীন ম্যাডাম। মোহনগঞ্জ পাইলট স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা আমার সন্তানসম।”
আর আমরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারি—
“আমরা পারভীন ম্যাডামের ছাত্রছাত্রী।”
কিছু শিক্ষক ক্লাস নেন।
কিছু শিক্ষক পরীক্ষা নেন।
আর কিছু শিক্ষক—
জীবনটা শিখিয়ে দেন।
পারভীন ম্যাডাম ছিলেন সেই দ্বিতীয় ধরনের শিক্ষক
আল্লাহ আপনাকে সুস্থ রাখুন, ভালো রাখুন, দীর্ঘ নেক হায়াত দান করুন।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.