অন্ধকার রাতে শহরের অদূরে এক পাহাড়ের গুহায় পাথুরে মেঝেতে নিবিষ্ট মনে বসে আছেন তিনি। গুহাটি তাঁর কাছে নতুন নয়, এর আগেও বহুবার এসেছেন। যখনই নৈমিত্তিক জীবন আর পাপ, অনাচারে ভরা পারিপার্শ্বিকতা দেখে মনটা বিষিয়ে ওঠে, যখনই একমনে বিশ্বচরাচরের স্রষ্টা, সৃষ্টির রহস্য আর মানুষের কল্যাণের পথ নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে জাগে, তখনই তিনি একাকী এই গুহায় চলে আসেন। সঙ্গে থাকে কিছু শুকনো খাবার আর সামান্য পানীয় জল। একনাগাড়ে কয়েকদিন বসে ভাবেন, ধ্যান করেন। ভাবেন ইব্রাহীম (আ:)-এর প্রচারিত ধর্মবিশ্বাস নিয়ে- যে বিশ্বাসকে তৎকালীন সময়ে ডাকা হতো ‘হানিফ’ নামে। বিক্ষিপ্ত মন কিছুটা শান্ত হলে আবার ফিরে যান লোকালয়ে।
সে রকমই গুহাটিতে আজও এসেছেন তিনি। নিচ্ছিদ্র মনে ভাবতে, প্রার্থনা করতে। বসে বসে একাগ্রচিত্তে সেটাই করছিলেন। হঠাৎ এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটলো- যা আগে কখনো ঘটেনি, পুরো গুহাটি ভরে উঠলো ধবধবে সাদা, চোখ ধাঁধানো অতি উজ্জ্বল আলোয়! সেই আলোর ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন এক অতিমানবীয় আকৃতি! যাঁকে আগে কখনো দেখেননি, চেনেনও না। তবে তাঁর অন্তর বলছে- এই অতি মানবীয় আকৃতি এই পৃথিবীর কেউ নন। তিনি এসেছেন এমন কোনো স্থান থেকে, যার অবস্থান মানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, তবে ধারণ করে অসীম কল্যাণ।
বেশ অবাক হলেন তিনি, কিছুটা ঘাবড়েও গেলেন। কে এই অতিমানবীয় আকৃতি? এই অন্ধকার গুহায় হঠাৎ করে কেন তাঁর আগমন? কী তাঁর উদ্দেশ্য?
আলোকোজ্জল আকৃতিখানা এগিয়ে এলো তাঁর দিকে। কাছে এসে তাঁকেই উদ্দেশ্য করে বললো- ‘পড়ো (ইকরা إقرا )’
মায়ের পেটে থাকতেই বাবা হারিয়ে প্রথমে দাদা, তারপর ছোটচাচার আদর-স্নেহে মানুষ হয়েছেন। কিশোর বয়সে পারিবারিক ব্যবসার কাজে জড়িয়ে প্রচলিত ধারায় লেখাপড়া করার সুযোগ পাননি। তাই তো লিখতে জানেন না, পড়তেও পারেন না। সুতরাং আলোকোজ্জল বিশেষ আকৃতির আহ্ববানের উত্তরে তিনি বললেন- ‘আমি তো পড়তে জানি না!’
আলোকোজ্জল আকৃতি আবার বলে উঠলো- ‘পড়ো (ইকরা إقرا )’
তিনি আবারও উত্তর দিলেন- ‘কিভাবে পড়বো? আমি তো পড়তে জানি না!’
আকৃতিটি এবার তাঁকে দু’-হাত মেলে জড়িয়ে ধরলো। বুকের সঙ্গে বুক মিশিয়ে চেপে ধরলো। হঠাৎ তিনি উপলব্ধি করলেন সস্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভূতি! যে অনুভূতির সঙ্গে তাঁর আগে কখনো পরিচয় ছিল না। কেউ কখনো বর্ণনাও করেনি। এই অনুভূতির জন্ম এই পৃথিবীতে নয়, ভিন্ন কোনো স্থানে। মহাপবিত্র, মহা শক্তিশালী কোনো এক সত্ত্বা!
কিছুক্ষণ বাদে অভূতপূর্ব অনুভূতি নিয়ে আলিঙ্গন-মুক্ত হলেন। আলোকোজ্জল আকৃতি আবার বলে উঠলো- ‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’
এবার ভীষণ অবাক হয়ে তিনি অনুভব করলেন যে, তিনি পড়তে পারছেন! অবলীলায়!! নি:সংকোচে!!!
আলোকোজ্জল আকৃতির সঙ্গে তিনি শুরু পড়তে লাগলেন...
‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে- যিনি তোমাকে সৃষ্টি করছেন। যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ছোট্ট এক রক্তের দলা থেকে। পড়ো তাঁর নামে যিনি সবচাইতে দয়ালু। যিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন কলম দ্বারা। আর মানুষকে দিয়েছেন সেই জ্ঞান- যা সে জানতো না।’
পড়া শেষ হলে সেই আলোকোজ্জল আকৃতি বিদায় নিলেন। গুহাখানি আবার ডুবে গেল অন্ধকারে। সদ্য ঘটে যাওয়া অতিমানবীয় এই অভিজ্ঞতায় তিনি তখন বিহ্বল! দ্রুত বের হয়ে এলেন গুহা থেকে। ছুটে চললেন শহরের ভেতরে নিজের ঘরের দিকে। দৌড়ে যখন ঘরে পৌঁছলেন, ততক্ষণে তাঁর চোখ রক্তবর্ণ লাল, শরীর প্রচন্ড শীতল আর নিঃশ্বাসে বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। যেন এক ঘোরগ্রস্থ মানুষ!
অবস্থা দেখে স্ত্রী দৌড়ে এলেন। বিপদে-আপদে গেল ১৫ বছর ধরে তিনিই তো তাঁর সঙ্গে আছেন সব সময়, প্রত্যেকটি পদক্ষেপে। উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন- কী হয়েছে তাঁর? তিনি এমন করছেন কেন?
তিনি বললেন- ‘আমাকে চাদর দিয়ে জড়িয়ে ধরো।’ তারপর কাঁপতে কাঁপতে স্ত্রীর কাছে পুরো ঘটনা খুলে বললেন।
স্ত্রী তাঁকে অভয় দিয়ে বললেন- ‘আপনি ভালো মানুষ। লোকে আপনাকে আল-আমিন বলে ডাকে। সব সময় সত্য কথা বলেন, ন্যায়ের পথে থাকেন। মানুষের উপকার করেন। আপনার কোনো ক্ষতি হবে না। বরং এ হয়ত আপনার জন্য আসা কোনো মহাপবিত্র ঐশ্বীবাণী। আপনার প্রত্যেকটি কথা সবার আগে আমি বিশ্বাস করলাম।’
স্ত্রীর কথা তাঁকে আশ্বস্ত করলে ধীরে ধীরে তিনি সুস্থির হলেন। শুরু হলো এক বিশ্বাসের নতুন করে পথ চলা- যা পরবর্তী প্রায় ১৫০০ বছর ধরে বদলে দিলো পৃথিবীর ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, সামাজিকতা সবকিছুই। শুরু হলো এক মহাপবিত্র গ্রন্থের মহা-আবির্ভাব যাত্রা- যা সেই রাতে শুরু হয়ে চলেছিল পরবর্তী সুদীর্ঘ ২৩ বছর ধরে, ধাপে ধাপে, নানা প্রাসঙ্গিকতায় একেকভাবে।
আজ থেকে প্রায় ১৫০০ বছর আগে, ৬০৯ খ্রিস্টাব্দে ডিসেম্বর মাসের এক রাতের ঘটনা এটি। আর সেই রাতটিই রমজানের শেষ দশদিনের যে কোনো বেজোড় রাতের একটি। মহাপবিত্র গ্রন্থ ‘কোরআন’ নাজিল শুরু হওয়ার রাত! মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:)-এর নবুয়তপ্রাপ্তির রাত! মহাপবিত্র ক্বদরের রাত!
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহকারী সম্পাদক : মোঃ ছাব্বির হোসেন
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
নির্বাহী সম্পাদক : মেছবাহ উদ্দিন (01884-553490, 01911-206989)
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.