নবী প্রেমের নজিরবিহীন ইতিহাস সৃষ্টিকারী শহীদ আলিমুদ্দিনের উকিল ছিল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
এই ইতিহাস প্রতিটি মুসলমানের জানা দরকার।
___________________________________________
১৯২০-এর দশকে অবিভক্ত ভারতের লাহোরে মহাশে রাজপাল নামের এক হিন্দু প্রকাশক 'রঙ্গিলা রসুল' নামক অত্যন্ত অবমাননাকর একটি বই প্রকাশ করে। এই বইটি মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত হানে। মুসলিমরা এই বইয়ের বিরুদ্ধে এবং প্রকাশকের শাস্তির দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ ও আইনি আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু তৎকালীন ব্রিটিশ আইন এবং আদালতের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে প্রকাশক রাজপাল শেষ পর্যন্ত খালাস পেয়ে যায় এবং বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াতে থাকে।
লাহোরের এক সাধারণ মুসলিম কাঠমিস্ত্রি পরিবারের ১৯ বছর বয়সী তরুণ আলিমুদ্দিন যখন জানতে পারেন যে, আইনিভাবে রাসূল (সা.)-এর অবমাননাকারীর কোনো শাস্তি হয়নি, তখন তাঁর মন ভেঙে যায়। রাসূল (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে তিনি নিজেই অবমাননাকারীকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বাজার থেকে মাত্র এক রুপিতে একটি ছুরি কেনেন এবং রাজপালের দোকানের দিকে রওনা হন।
১৯২৯ সালের ৬ই এপ্রিল আলিমুদ্দিন লাহোরের আনারকলি বাজারে রাজপালের দোকানে প্রবেশ করেন। শত পুলিশি পাহারা ও নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে তিনি প্রকাশক রাজপালের বুকে সরাসরি ছুরি আঘাত করেন। ঘটনাস্থলেই রাজপালের মৃত্যু হয়। ঘটনার পরপরই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তার হওয়ার পর আলিমুদ্দিন বিন্দুমাত্র অনুশোচনা প্রকাশ করেননি, বরং তিনি গর্বের সাথে নিজের অপরাধ স্বীকার করেন। ব্রিটিশ আদালতে তাঁর পক্ষে মামলা লড়েছিলেন বিখ্যাত আইনজীবী এবং পাকিস্তানের তৎকালীন প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। জিন্নাহ সাহেব আলিমুদ্দিনের ফাঁসি মওকুফ করিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন। শিখিয়ে দিয়েছিলেন, আলিমুদ্দিন তুমি কোন অপরাধ করোনি, তোমার ভয়ের কিছু নেই, তুমি মুক্তি পাবে। তোমাকে আমি যা বলি তুমি তা করিও, বাকিটুকু আমি বুঝব। তুমি বলিও, আমি যখন রাজপালের বুকে আঘাত করি, তখন আমার হিতাহিত জ্ঞান ছিল না, আমি একটা ঘোরের মাঝে ছিলাম।
তারপর তোমাকে মুক্ত করার বাকি দায়িত্ব আমার।
আলিমুদ্দিন তখন কিছু বলেনি, কিন্তু যখন তাকে বিচারক জিজ্ঞাসা করেছিল; সত্যিই কী তোমার জ্ঞান ছিল না?
তখন আলিমুদ্দিন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে, অত্যান্ত দৃঢ় ও গম্ভীর কণ্ঠে বলেছিলেন, বিচারক সাহেব, সারা জীবন আমি পাগল ছিলাম, কিন্তু যখন নবীর দুশমনের গায়ে আঘাত করি, তখন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলাম, আমি স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে, নবীর দুশমনকে খু°ন করি। তারপর ঠোঁটের কোনায় মুচকি হাসি রেখা টেনে বলেছিলেন, আপনি আমার ফাঁসির রায় দেন।
১৯২৯ সালের ৩১শে অক্টোবর তদানীন্তন মিয়ানওয়ালি কারাগারে আলিমুদ্দিনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময়ও তাঁর মুখে কোনো ভয়ের ছাপ ছিল না, বরং তিনি অত্যন্ত হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরে নেন।
আলিমুদ্দিনের শাহাদাতের পর তাঁর জানাজায় তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের লাখ লাখ মুসলিম অংশ নেন। উপমহাদেশের বিখ্যাত কবি ও দার্শনিক আল্লামা ইকবাল তাঁর মরদেহ কবরে নামানোর সময় কেঁদে ফেলে বলেছিলেন:—
"এই অশিক্ষিত ছুতারের ছেলেটি আমাদের মতো হাজারো শিক্ষিত লোকের চেয়ে এগিয়ে গেল এবং বাজি জিতে নিল।
→ শহীদ আলিমুদ্দিন তাঁর জীবনের এই ইতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি নেওয়ার পেছনে লাহোরের মসজিদের খতিব সাহেবের জুমার বয়ানের অনুপ্রেরণা ছিল।
হুজুর জোরালো ভাষণ দিয়েছিলেন, নবীর দুশমন আল্লাহর জমিনে বেঁচে থাকতে পারে না, শাতিমে রাসূলের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড; এবং হুংকার দিয়ে বলেছিলেন, এই ভারতবর্ষে কী কোন আশেকে রাসূল নেই?—যে নবীর এই দুশমনকে সোজা জাহান্নামে পাঠিয়ে দিবে?
তখনই আলিমুদ্দিন সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।
→আলিমুদ্দিনের হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে চলে যাওয়ার পেছনে ছিল একটি অলৌকিক স্বপ্ন।
সপ্নটি হলো,—
লাহোরের মিয়ানওয়ালি সেন্ট্রাল জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে
আলিমুদ্দিন তখন বন্দি।
ঘড়ির কাঁটা যত টিকটিক করে এগিয়ে চলছে, তাঁর ফাঁসির দিন তত ঘনিয়ে আসছে। কিন্তু জেলের ভেতরে থাকা এই তরুণের মুখে ভয়ের কোনো ছাপ নেই, বরং সেখানে খেলা করছে এক অপার্থিব জান্নাতি আলো। ফাঁসির ঠিক কয়েক দিন আগে আলিমুদ্দিনের সাথে জেলের ভেতরে শেষবারের মতো দেখা করতে আসেন তাঁর বৃদ্ধা মা।
দীর্ঘ আইনি লড়াই, সমাজের চাপ আর বুক ফেটে যাওয়া কষ্ট নিয়ে মা যখন লোহার শিকের ওপাশে এসে দাঁড়ালেন, তখন আর নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না।
একমাত্র কলিজার টুকরো ছেলেকে ফাঁসির দড়ির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মায়ের চোখ দিয়ে অবিরাম ধারায় অশ্রু ঝরতে লাগল। শিকের ওপাশ থেকে মা শুধু তাকিয়ে রইলেন তাঁর নিষ্পাপ ছেলের মুখের দিকে। মায়ের চোখের এই পানি আলিমুদ্দিনের হৃদয় স্পর্শ করল। কিন্তু তিনি দমে গেলেন না, বরং পরম মমতায় শিকের ফাঁক দিয়ে মায়ের হাত দুটি জড়িয়ে ধরলেন। মায়ের চোখের অশ্রু মুছে দিয়ে এক বুক আত্মবিশ্বাস আর স্বর্গীয় হাসি নিয়ে আলিমুদ্দিন বললেন:
"মা গো ! তুমি কেন কাঁদছ?
তোমার চোখে পানি কেন?
তুমি কি জানো না, তোমার এই অধম ছেলের নসিব কত বড়!
মা, তুমি কেঁদো না।
আমি গতরাতে নবীজি সা.-কে স্বপ্নে দেখেছি।
নবীজি (সা.) সাহাবীদের একটি বিশাল জামাত নিয়ে কারাগারের ভিতরে উপস্থিত হয়েছেন, আমার মাথায় হাত দিয়ে বলেছেন, 'ইলমুদ্দিন, তুমি মাথানত করো না; আল্লাহ তোমাকে শহীদ হিসাবে কবুল করেছেন। আমি তোমাকে স্বাগত জানাতে এসেছি।
মা! মাগো! এই যে তুমি শুঁকে দেখ এখনো আমার গায়ে নবীজির সেই জান্নাতি সুগন্ধি লেগে আছে।
নবীপ্রেমের এমন পর্বতসম দৃঢ়তা দেখে; নবীজীর গায়ের সেই জান্নাতি ঘ্রাণ শুঁকে আলিমুদ্দিনের মায়ের ভেতরের সব কষ্ট ও হাহাকার মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। চোখের পানি মুছেলেন তাঁর মা।
আলিমুদ্দিনের ফাঁসি হয়ে যায়।
কিন্তু সেই ফাঁসির দৃশ্যটি ইতিহাসের পাতায় এক অমর আশেকে রাসুলের কিংবদন্তি ইতিহাস হিসেবে চিরদিনের জন্য অমর হয়ে যায়।
লেখক-
মুহাম্মদ আনাস হুসাইন
ময়মনসিংহ
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাত ১১ : ৩৮ মিনিট ||
________________________________________________
#ইতিহাস #জিন্নাহ #রাজনীতি
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.