ধরলার ভয়াল ভানে হুমকিতে লালমনিরহাট শহররক্ষা বাঁধ
এক সপ্তাহে নদীগর্ভেছ বিলীন ৩৫০ বিঘা আবাদি জমি।
লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধ
রওশন বাবু ০১৭২৫১৯২৪২৪
ধরলা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে লালমনিরহাট সদর উপজেলার মোগলহাট ইউনিয়নের ইটাপোতা ও কুরুল এলাকায় শহররক্ষা বাঁধ ধসে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে বাঁধের প্রায় ৬০ মিটার এলাকায় বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে মোগলহাট ও কুলাঘাট ইউনিয়নের অন্তত আটটি গ্রামের প্রায় ৩৫০ বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিনই নদী গিলে খাচ্ছে নতুন নতুন জমি। ফলে ফসলি জমি হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন ধরলাপাড়ের শত শত কৃষক।
স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), জনপ্রতিনিধি ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, লালমনিরহাট সদর উপজেলার ধরলা নদীর ডান তীরে নির্মিত ১৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধই মূলত লালমনিরহাট শহররক্ষা বাঁধ হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে প্রায় ১০ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার অংশ বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নদীর তীব্র স্রোত ও ভাঙনের কারণে বাঁধটির বিভিন্ন অংশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
পাউবো বলছে, ঝুঁকিপূর্ণ অংশটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভাঙনের মুখে পড়তে পারে পুরো বাঁধ। আর সেই পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে লালমনিরহাট শহরসহ বিস্তীর্ণ জনপদ ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ২০১৭ সালের বন্যার স্মৃতি এখনও আতঙ্কের নাম। ওই বছরের ভয়াবহ বন্যায় কুলাঘাট ইউনিয়নের শিবেরকুটি এলাকায় শহররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০০ মিটার অংশ ধসে যায়। এর ফলে ধরলার পানি দ্রুত লালমনিরহাট শহরে ঢুকে পড়ে। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে আবাসিক এলাকা পর্যন্ত তলিয়ে যায়। সেই বন্যায় শিশুসহ চারজনের মৃত্যু হয় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে পুরো সদর উপজেলা।
মোগলহাট ইউনিয়নের কুরুল গ্রামের ৭৭ বছর বয়সী কৃষক যাত্রামোহন বর্মণের জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছে ধরলা নদী। এক যুগ আগে নদীভাঙনে তার ১০ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়। এরপর অবশিষ্ট ছিল সাত বিঘা। কিন্তু গত এক সপ্তাহেই আরও তিন বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। এখন বাকি চার বিঘাও ভাঙনের মুখে।
নদীর পাড়ে বসে চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘ধরলা নদী হামাকগুলাক শ্যাষ করি ফ্যালাইছে। যেইকনা ভুঁই আছলো তাঙ এ্যালা নদীত চলি যাবার নাইকছে। হামরাগুলা ক্যাং করি বাঁইচমো। মরা ছাড়া হামারগুলার কোন পথ খোলা নাই।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘নদী বান্ধিতে যে টাকা খরচ হয় তার চেয়ে ৫০ গুণ বেশি টাকার জমি নদীত চলি যায়। সরকার যায়, সরকার আইসে—কাইও হামার কষ্ট বোঝে না। এ্যালাং নদীটা বান্ধি দিলেও হামারগুলার কিছু ভুঁই বাইচবে।’
বুমকা এলাকার কৃষক পুলিন চন্দ্র বর্মণও নদীভাঙনের নির্মম শিকার। গত এক যুগে তার ১৩ বিঘা জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট ছিল ছয় বিঘা। গত এক সপ্তাহে আরও দুই বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। এখন মাত্র চার বিঘা জমি নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘আবাদ ছাড়া হামরাগুলা আর কিছুই কইরবার পাই না। অল্প এ্যাকনা জমি আছে, তাকো যদি নদীত যায় তা হইলে হামারগুলার মরণ ছাড়া কোন উপায় নাই। জমিই হলো হামারগুলার জীবন, সেই জমি চলি যাবার নাইকছে।’
ইটাপোতা এলাকার কৃষক মন্টু মিয়া (৫৫) বলেন, শহররক্ষা বাঁধের যে অংশে ভাঙন শুরু হয়েছে, সেটি দ্রুত রক্ষা করা না গেলে কয়েক হাজার হেক্টর আবাদি জমি এবং কয়েক হাজার বসতভিটা নদীভাঙনের ঝুঁকিতে পড়বে। তার মতে, এই বাঁধটি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা গেলে ধরলার ডান তীরের দীর্ঘদিনের ভাঙনও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
কুলাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইদ্রিস আলী বলেন, ২০১৭ সালে বাঁধের ছোট একটি অংশ ভেঙে যাওয়ার পর যে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা এখনও মানুষ ভুলতে পারেনি। এবারও যদি শহররক্ষা বাঁধ রক্ষা করা না যায়, তাহলে শুধু লালমনিরহাট শহরই নয়, আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যা ও নদীভাঙনের মুখে পড়বে। এতে হাজার হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কয়েক হাজার কোটি টাকার আবাদি জমি, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বলেন, ধরলা নদীর ডান তীর সংরক্ষণ প্রকল্পটি গত ১৫ এপ্রিল প্রি-একনেক (পিইসি) সভায় অনুমোদন পেয়েছে। বর্তমানে এটি একনেকের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে শহররক্ষা বাঁধ স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং ধরলার ডান তীরের ভাঙনও রোধ করা যাবে। কিন্তু চলতি অর্থবছরের মধ্যেই কাজ শুরু করা না গেলে ধরলার ডান তীরে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।’
ধরলার অব্যাহত ভাঙন শুধু কৃষকের জমিই গ্রাস করছে না, ধীরে ধীরে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে পুরো লালমনিরহাট শহরকেও। স্থানীয়দের দাবি, বর্ষার ভরা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আগেই দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন ও স্থায়ী নদীশাসনের কাজ শুরু করা জরুরি। অন্যথায় ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.