দুনিয়া যখন আখিরাতের পুঁজি
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
দুনিয়ার প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন। জীবিকার প্রয়োজন, পরিবারের দায়িত্ব, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা এসবই মানুষকে সম্পদ অর্জনের পথে পরিচালিত করে। কিন্তু ইসলাম দুনিয়াকে কখনোই মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেনি, বরং একে আখিরাতের শস্যক্ষেত্র হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। তাই হালাল উপায়ে সম্পদ উপার্জন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তা ব্যয় করা নিছক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, বরং তা ইবাদতেরই একটি উজ্জ্বল রূপ। বিপরীতে, হারাম পথে সম্পদ অর্জন কিংবা সেই সম্পদকে পাপাচারের উপকরণে পরিণত করা মানুষের জন্য দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনেরই বিপর্যয়ের কারণ।
এই সত্যটিই গভীর প্রজ্ঞার সঙ্গে ব্যক্ত করেছেন ইয়াহইয়া ইবনু মু'আয রহ.। তিনি বলেন,
❝আমি তোমাদের দুনিয়া ত্যাগ করার আহ্বান জানাই না; বরং গুনাহ ত্যাগ করার আহ্বান জানাই। কারণ দুনিয়া ত্যাগ করা একটি ফজিলত, আর গুনাহ ত্যাগ করা ফরজ। তাই ফজিলতের আগে ফরজ আদায়ই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।❞
এই সংক্ষিপ্ত উক্তির মধ্যেই ইসলামের জীবনদর্শনের এক অনন্য ভারসাম্য প্রতিফলিত হয়েছে। ইসলাম মানুষকে সংসারবিমুখ হতে শেখায় না, শেখায় সংসারের মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি খুঁজে নিতে। সম্পদ অর্জনকে নিরুৎসাহিত করে না, বরং সম্পদের ওপর হৃদয়ের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়।
মানুষের চাহিদা সীমাহীন, কিন্তু প্রয়োজন সীমিত। অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান জীবনধারণের জন্য এর বেশি খুব বেশি কিছু অপরিহার্য নয়। আল্লাহর পথে নিবেদিত একজন মানুষেরও এই মৌলিক চাহিদা রয়েছে। তবে সেই প্রয়োজন পূরণের পথ হতে হবে হালাল, পবিত্র এবং শরিয়তসম্মত। কারণ সমস্যা সম্পদে নয়, সমস্যা তার প্রতি অন্ধ আসক্তিতে। প্রয়োজন যখন লোভে রূপ নেয়, তখন মানুষ সম্পদের মালিক হয় বটে, কিন্তু নিজের নফসের বন্দিও হয়ে পড়ে। ধন বৃদ্ধি পায়, অথচ অন্তরের প্রশান্তি ক্রমেই ক্ষয় হতে থাকে।
দুনিয়ার মোহের এই পরিণতি বোঝাতে একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত কল্পনা করা যায়। এক মুসাফির দীর্ঘ সফরে বেরিয়েছে। যাত্রার জন্য যতটুকু রসদ প্রয়োজন, তার চেয়ে অনেক বেশি সংগ্রহ করতেই সে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এরপর উটটিকে সাজাতে লাগল বাহারি অলংকারে। এই সাজসজ্জার মধ্যেই সে এতটাই নিমগ্ন হয়ে গেল যে খেয়ালই করল না, কাফেলা অনেক আগেই যাত্রা শুরু করেছে। সঙ্গীরা দিগন্ত পেরিয়ে গেছে, আর সে রয়ে গেছে নির্জন প্রান্তরে একা, অসহায় এবং বিপদের মুখোমুখি।
দুনিয়ার মোহে নিমগ্ন মানুষের অবস্থাও অনেকটা এমনই। সম্পদ, পদমর্যাদা ও ভোগের পেছনে ছুটতে ছুটতে সে ভুলে যায়, জীবনের প্রকৃত সফর তো আখিরাতের দিকে। একসময় ফিরে তাকিয়ে দেখে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতিটিই আর নেওয়া হয়নি।
তবে ইসলামের শিক্ষা কখনো বৈরাগ্যের নয়। প্রয়োজনীয় সম্পদ অর্জন, পরিবারকে স্বচ্ছল রাখা এবং সম্মানজনক জীবনযাপন এসবও দ্বীনেরই অংশ। কারণ অভাব কখনো কখনো মানুষকে দুর্বল করে দেয়, আর বৈধ সামর্থ্য অনেক ইবাদত ও কল্যাণকর কাজকে সহজ করে তোলে। তাই দুনিয়াকে প্রত্যাখ্যান নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ করাই মুমিনের পরিচয়।
আওন ইবনু আব্দুল্লাহ রহ. বলেন,
❝দুনিয়া ও আখিরাত মানুষের অন্তরে দাঁড়িপাল্লার দুই পাল্লার মতো। একটিকে যত ভারী করবে, অন্যটি তত হালকা হয়ে যাবে।❞
এই উপমা শুধু হৃদয়ের বাস্তবতাই নয়, মানুষের জীবনের গতিপথও স্পষ্ট করে দেয়। দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত অনুরাগ যত বাড়ে, আখিরাতের প্রতি মনোযোগ তত কমে যায়। আবার যার হৃদয় আখিরাতমুখী, সে দুনিয়াকে ব্যবহার করে দুনিয়ার দ্বারা ব্যবহৃত হয় না।
হাসান বসরি রহ.'কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে করুণ আর্তনাদ কার হবে? তিনি বলেছিলেন, 'যাকে আল্লাহ নিয়ামত দিয়েছিলেন, অথচ সে সেই নিয়ামতই ব্যয় করেছে আল্লাহর অবাধ্যতার পথে।'
এই উত্তর আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সম্পদ কখনো নিজে কল্যাণ কিংবা অকল্যাণের উৎস নয়। সম্পদের মূল্য নির্ধারিত হয় তার উৎস ও ব্যবহারের মাধ্যমে। হালাল উপার্জনের একটি রুটিও আল্লাহর কাছে মূল্যবান হতে পারে, আবার হারাম সম্পদের পাহাড়ও হতে পারে চিরস্থায়ী অনুশোচনার কারণ।
অন্যদিকে, যে সম্পদ মানুষকে আল্লাহর ইবাদতে শক্তি জোগায়, পরিবারকে হালাল আহার দেয়, অসহায়ের মুখে হাসি ফোটায়, দ্বীনের খেদমতে ব্যয় হয়, জ্ঞানচর্চা ও মানবকল্যাণে অবদান রাখে—সেই সম্পদ নিছক অর্থ নয়, তা এক মহামূল্যবান আমানত। এমন সম্পদ মানুষকে দুনিয়ায় মর্যাদা দেয়, আর আখিরাতে হয়ে ওঠে নাজাতের পাথেয়।
অতএব, প্রশ্ন সম্পদ অর্জনের নয়, প্রশ্ন তার উদ্দেশ্যের। দুনিয়া কখনো মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, যদি সে দুনিয়াকে আখিরাতের সোপান হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। হালাল উপার্জন, পবিত্র নিয়ত এবং কল্যাণমুখী ব্যয় এই তিনটি একত্রিত হলে দুনিয়ার কর্মই ইবাদতে রূপ নেয়।
মুমিনের কাছে দুনিয়া গন্তব্য নয়, পথ। সম্পদ অহংকারের অলংকার নয়, আল্লাহর অর্পিত আমানত। আর উপার্জন কেবল জীবিকার ব্যবস্থা নয়, বরং রবের সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহিমান্বিত উপায়। যে মানুষ এই সত্য উপলব্ধি করতে পারে, তার কাছে দুনিয়া আর আখিরাতের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং একে অপরের পরিপূরক।
লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.