দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত রদবদল
ড. শেখ আকরাম আলী
সময় ও প্রয়োজনের সাথে সাথে কৌশল পরিবর্তিত হয়। গত পাঁচ দশকে ভারত দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু তারা তাদের প্রতিবেশীদের কাছ থেকে তীব্র চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে এবং বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব এ অঞ্চলে তাদের বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর এমন অতিরিক্ত হুমকি যোগ করেছে, যা তারা অতীতে কখনো অনুভব করেনি। জুলাইয়ের চেতনা বাংলাদেশের মানুষের মনস্তত্ত্ব বদলে দিয়েছে এবং তারা এখন বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থকে সবকিছুর ওপরে রেখে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে দেখতে অত্যন্ত ব্যাকুল। কিন্তু একমাত্র ভারতই এটিকে তাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী বলে মনে করে।
সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বা 'মক্কা প্যাক্ট' তাদের দুশ্চিন্তার মাত্রা বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মক্কা প্যাক্টকে মুসলিম বিশ্বের 'ন্যাটো' (NATO) হিসেবে বর্ণনা করছেন। তারা এটিকে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন বলে মনে করেন। মক্কা প্যাক্টের বিধান অনুযায়ী, ন্যাটো ভুক্ত দেশগুলোর মতোই—যেকোনো একটি সদস্য দেশের ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে বাকি তিন দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে।
সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তান এই নতুন গঠিত প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য; যেখানে সৌদি আরব অর্থায়ন ও জ্বালানি সম্পদ সরবরাহ করে, তুরস্ক উন্নত সামরিক প্রযুক্তি প্রদান করে এবং পাকিস্তান সামরিক জনবল পাঠায়। এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা জোট বর্তমান বৈশ্বিক কৌশলগত বিন্যাসে এক নতুন শক্তির জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি একে শীর্ষমানের নিরাপত্তা ও সুদূরপ্রসারী কৌশলগত শক্তি জুগিয়েছে। এটি অন্য দুটি দেশকে এক ধরণের মানসিক নিরাপত্তাও দেয়।
আমেরিকার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর সৌদি আরবের নির্ভরতা কমে যাবে এবং তারা এখন থেকে যেকোনো সংঘাত ও ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত সুরক্ষা আশা করতে পারে। মক্কা প্যাক্টের মাধ্যমে এটি নিঃসন্দেহে তাদের প্রতিরক্ষা কৌশলে এক নতুন মোড়। বিশ্লেষকরা একে পারস্য উপসাগর, দক্ষিণ এশিয়া এবং ইউরোপকে সংযোগকারী এক বড় কৌশলগত ব্লক হিসেবে দেখছেন, যদিও এটি ন্যাটোর মতো অতটা প্রথাগত বা বিশাল নয়। তবে চুক্তিটিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এটি কোনো দেশ বা শক্তির বিরুদ্ধে নয়।
তবে অদূর ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি দেশের এই মক্কা প্যাক্টে যোগদানের সম্ভাবনা রয়েছে। ইরান ও বাংলাদেশকে এতে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং আমেরিকা ইতিমধ্যেই এই নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। অন্যদিকে অনেকে মনে করেন, এই চুক্তির পেছনে চীনের হাত থাকতে পারে। তবে বিষয়টি নিশ্চিত যে, মক্কা প্যাক্ট ভবিষ্যতে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে।
এর গঠনের পেছনে কারণ যাই থাক না কেন, বাস্তবতা হলো এটি এখন এক চরম সত্য এবং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভবিষ্যতের ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি এতে যোগ দেয়, যা খুবই সম্ভাব্য, তবে তা অদূর ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দেবে। ভারত এটিকে এ অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে উপভোগ করে আসা তাদের একক আধিপত্যের ওপর একটি বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে এবং বাংলাদেশকে মক্কা প্যাক্টে যোগ না দেওয়ার জন্য বোঝাতে সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এই মুহূর্তে তারেক রহমানের ভারত সফর না করার সিদ্ধান্ত ভারতের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে সতর্ক করে বলেছেন যে, মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যতে এর severe পরিণতি হতে পারে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা যে ভারত এমন পদক্ষেপ কখনো ভালোভাবে নেবে না। আর তাই ভারত যেকোনো সময় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
সম্প্রতি নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জনাব হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন যে, বাংলাদেশ মক্কা প্যাক্টে যোগদানের সম্ভাবনা পর্যালোচনা করে দেখছে। বাংলাদেশের সামনে এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ এবং নিজস্ব স্বার্থেই তাদের মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়া উচিত। পুরো জাতি এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাবে এবং তারেক রহমানের বর্তমান সরকারের পাশে দাঁড়াবে।
এটি দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট একটি দেশের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে পারে এবং একই সাথে বাংলাদেশ ভারতের সাথে তার সম্পর্কের একটি ভারসাম্য তৈরি করতে সক্ষম হবে। সবকিছুর ওপরে, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক সহায়তার পাশাপাশি বাংলাদেশ সৌদি আরবে আরও বেশি জনশক্তি রপ্তানি করতে পারবে এবং বেশি রেমিট্যান্স অর্জন করতে সক্ষম হবে। অদূর ভবিষ্যতে অর্থনীতি ও সামরিক বাহিনী দুই ক্ষেত্রেই অগ্রগতি দেখা যাবে। দেশটি সৌদি আরবের কাছ থেকে জ্বালানি সহায়তার প্রত্যাশাও করতে পারে, যা নিঃসন্দেহে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতের চাপ দূর করবে।
যেহেতু বাংলাদেশ বিশ্বের একমাত্র দেশ যার প্রতিবেশী হিসেবে কোনো মুসলিম দেশ নেই, তাই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো কয়েকটি বন্ধুভাবাপন্ন দেশকে পাশে পাওয়া কেবল এই চুক্তির সদস্য হওয়ার মাধ্যমেই বাংলাদেশের মানুষের মনোবল ও আত্মবিশ্বাসের স্তর বহুলাংশে বাড়িয়ে দিতে পারে।
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের মানুষের মন মানসিকতা মৌলিকভাবে পরিবর্তন করে দিয়েছে এবং তারা জীবন দিতে প্রস্তুত, কিন্তু জুলাইয়ের চেতনা বিকিয়ে দিতে রাজি নয়। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী শক্তি যেকোনো ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ সাহসের সাথে মোকাবিলা করতে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে অনেক ইস্যুতে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা সংক্রান্ত জাতীয় ইস্যুতে তারা ঐক্যবদ্ধ। বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে এক সক্রিয় ও প্রভাবশালী সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।
একই সাথে, বাংলাদেশ কোনো সংঘাতে বিশ্বাস করে না, বরং যেকোনো মূল্যে প্রতিবেশীদের সাথে ভবিষ্যতে শান্তি বজায় রাখতে চায়। ভারতেরও উচিত আমাদের সাথে সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশের প্রতি সঠিক মনোভাব গড়ে তোলা। এখনো বহু ইস্যু অমীমাংসিত রয়েছে এবং দুই দেশের স্বার্থেই এগুলো সমাধানের জন্য উভয় দেশের আন্তরিকতা প্রয়োজন। এটি আর একমুখী প্রক্রিয়া থাকা উচিত নয়। দুই দেশের মধ্যকার আগামী দিনের সম্পর্ক হওয়া উচিত উভয়ের জন্যই কল্যাণকর চেতনার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক
শেখ হাসিনার পতনের পর উদ্ভূত পরিস্থিতি ভারতকে এমন এক অপ্রত্যাশিয় সংকটে ফেলে দিয়েছে, যা তারা কখনো কল্পনাও করেনি এবং একই সাথে সহজে মেনেও নিতে পারছে না। ভারতের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম মূল সমস্যা হলো—তারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সাথে বন্ধুত্বের চেয়ে নির্দিষ্ট একটি দল (আওয়ামী লীগ)-এর সাথে সম্পর্ক রক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে হলে ভারতকে তাদের এই পুরোনো মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে; অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে তারা এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীকে চিরতরে হারানোর ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। বাংলাদেশের জনগণ এখন “বিশ্বাস ছাড়া বন্ধুত্ব নয়” (No trust, no friendship) নীতিতে বিশ্বাসী। কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক তত্ত্ব দিয়ে এই দেশের মানুষকে আর প্রভাবিত করা যাবে না, বরং তা সাধারণ মানুষের মনে ভারতের প্রতি অবিশ্বাসের দেয়ালকে আরও দীর্ঘ করবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ যাতে 'মক্কা প্যাক্ট'-এ যোগ না দেয়, সে বিষয়ে ভারত অত্যন্ত তৎপর। রয়টার্সের মতো পশ্চিমা গণমাধ্যমের সাহায্যে তারা এই চুক্তির বিরুদ্ধে নানা নেতিবাচক বর্ণনা তৈরি করছে এবং ফার্স্টপোস্টের মতো তাদের নিজস্ব গণমাধ্যমের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতি পরোক্ষ হুমকি প্রদর্শন করছে। মক্কা প্যাক্টকে শুরুতেই ধূলিসাৎ করার জন্য ভবিষ্যতে পাকিস্তান-বিরোধী ইসরায়েল-ভারত যৌথ সামরিক অভিযানের সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি আগ্রাসন মোকাবিলায় সিরিয়ায় তুর্কি সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি এবং পাকিস্তানের নূর এয়ার বেসে তুরস্ক ও চীনের তৈরি সামরিক সরঞ্জামের উপস্থিতি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে অদূর ভবিষ্যতে বড় ধরণের সামরিক তৎপরতা ঘটতে পারে। একই সাথে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের বেইজিং সফর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের মস্কো সফর কোনো বড় ধরণের কৌশলগত ছক আঁকার লক্ষণ প্রকাশ করে।
মক্কা প্যাক্ট মূলত তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কৌশলকে অত্যন্ত শক্তিশালী করেছে, যা তাদের শত্রুপক্ষের যেকোনো হুমকি যৌথভাবে ও আত্মবিশ্বাসের সাথে মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। এই জোট দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে এবং এর ফলে ভারত তাদের প্রতিবেশীদের, বিশেষ করে বাংলাদেশের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ করতে বাধ্য হবে। বাংলাদেশ যদি শেষ পর্যন্ত মক্কা প্যাক্টে যোগ নাও দেয়, তবুও এই জোটের উপস্থিতি ভারতকে এ অঞ্চলে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করা থেকে বিরত রাখবে। তবে বাংলাদেশের জন্য এই প্যাক্টে যোগ দেওয়াটাই হবে সবচেয়ে কৌশলগত ও উপযোগী সিদ্ধান্ত।
---
(লেখক: আইনের অধ্যাপক, ২৮ জুলাই ২০২৬)
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.