তিস্তা পাড়ে পরিকল্পিত ড্রেজিং ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করবে সরকার: পানিসম্পদ মন্ত্রী
তিস্তা ব্যারেজ পরিদর্শন করলেন তিন মন্ত্রী
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
তিস্তা নদীর ভাঙন, আকস্মিক বন্যা এবং পানির প্রবাহজনিত দুর্ভোগ থেকে উত্তরাঞ্চলের মানুষকে রক্ষায় সরকার দ্রুত পরিকল্পিত ড্রেজিং ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেবে বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। একই সঙ্গে তিনি তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন ও জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে এর বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
শুক্রবার দুপুরে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা ব্যারেজ এলাকা পরিদর্শন শেষে ব্যারেজের অবসর রেস্ট হাউসে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজিব প্রধান ও রোকন উদ্দিন বাবুলসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
পানিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ থেকে পানি ছেড়ে দেওয়ার ফলে তিস্তায় হঠাৎ প্রবল স্রোত সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে নদীর তীরবর্তী এলাকায় ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিচ্ছে এবং প্রতিবছর হাজারো পরিবার বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে।
তিনি বলেন, “উজান থেকে যেভাবে খাড়া স্রোতে পানি নেমে আসছে, তাতে তিস্তার পাড় ভেঙে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় পানি উপচে পড়ে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে। আমরা যদি পরিকল্পিতভাবে নদী ড্রেজিং ও দীর্ঘস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে পারি, তাহলে এই অঞ্চলের মানুষকে স্থায়ীভাবে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।”
মন্ত্রী আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেjক রহমানের নির্দেশনায় বিশেষজ্ঞ দল নিয়ে সরেজমিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে নদী ব্যবস্থাপনা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়।
তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রসঙ্গ তুলে শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, তিস্তা শুধু রংপুর অঞ্চলের মানুষের সমস্যা নয়, এটি জাতীয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। নদীটির সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং লাখো মানুষের জীবিকা জড়িত।
তিনি বলেন, “তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু বন্যা ও নদীভাঙন কমবে না, বরং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির বিকাশ ঘটবে। উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলার দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ একসময় উন্নয়ন ও সম্ভাবনায় রূপ নেবে।”
মন্ত্রী জানান, এটি একটি বৃহৎ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প। প্রয়োজনীয় কারিগরি ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা সম্পন্ন করে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)-এ উপস্থাপন করা হবে। তিনি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মতো তিস্তা প্রকল্পকেও জাতীয় অগ্রাধিকারভিত্তিক উন্নয়ন কর্মসূচি হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন।
তবে মন্ত্রীদের এ সফরকে ঘিরে তিস্তাপাড়ের মানুষের মধ্যে আশার পাশাপাশি সংশয়ও রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসা স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, তারা আর নতুন প্রতিশ্রুতি শুনতে চান না; দেখতে চান দৃশ্যমান অগ্রগতি।
তিস্তা ব্যারেজ এলাকার কৃষক জসিম উদ্দিন (৬৫) বলেন, “তিনজন মন্ত্রী এসেছেন, এটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা এখনো তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো সময়সূচি বা সিদ্ধান্ত জানতে পারিনি। শুধু নদী ড্রেজিং ও বাঁধ নির্মাণ করলেই তিস্তাপাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট দূর হবে না।”
তিনি বলেন, “প্রতিবছর বন্যা ও ভাঙনে আমরা জমি হারাই, ঘর হারাই। আমাদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই। সেই সমাধান তিস্তা মহাপরিকল্পনার মধ্যেই রয়েছে।”
একই এলাকার কৃষক আনছার আলী মণ্ডল (৬০) বলেন, “তিস্তাপাড়ের মানুষ আশা করেছিল মন্ত্রীরা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেবেন। কিন্তু আমরা তা পাইনি। বছরের পর বছর ধরে শুধু আশ্বাস শুনে আসছি। এখন বাস্তব কাজ দেখতে চাই।”
তিনি আরও বলেন, “তিস্তার মানুষকে নিয়ে আর রাজনীতি নয়, প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগ। আমাদের একটাই দাবি—দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু ড্রেজিং বা বিচ্ছিন্ন বাঁধ নির্মাণ করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।”
তিস্তা অববাহিকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নদী শাসন, স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, নদীভাঙন রোধ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধাসহ বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষি ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.