"জীবনটা অনেক ছোট, কিন্তু এই জীবনের হেফাজতের দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই।"-মোঃ নুরুল করিম ভূইয়া ডিসি গাজীপুর
মোঃ আরিফুল ইসলাম মুরাদ সিনিয়র সাংবাদিক স্টাফ রিপোটার দৈনিক বাংলার সংবাদ
গাজীপুর || ২২ জুন, ২০২৬
"একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না" — মহাসড়কের পাশে কিংবা বাসের পেছনে ঝুলতে থাকা এই চেনা বাক্যটি আমাদের যাপিত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই আটপৌরে সতর্কবার্তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্ষত কতটা গভীর? একটি মুহূর্তের অসাবধানতা কিংবা সামান্য একটু বেপরোয়া মনোভাব কীভাবে একটি সাজানো সংসারকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিতে পারে, তার প্রকৃত ভয়াবহতা পরিসংখ্যানের ঠান্ডা হরফে কখনো প্রকাশ পায় না। সেই নির্মম বাস্তবতার কিছু খণ্ডচিত্র সম্প্রতি উন্মোচিত হলো গাজীপুরে।
উপলক্ষটি ছিল গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও বিআরটিএ কর্তৃক আয়োজিত বিশেষ এক অনুষ্ঠান। "জেলা সড়ক নিরাপত্তা কমিটির কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন সংক্রান্ত কর্মশালা" শেষে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ করা হচ্ছিল। ১ কোটি ১ লক্ষ টাকার মোট ৩৫টি চেক। আপাতদৃষ্টিতে এটি রাষ্ট্রের একটি মানবিক উদ্যোগ, কিন্তু অনুষ্ঠানস্থলের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল স্বজনহারা মানুষের কান্নায় আর পঙ্গুত্বের আকুল আকুতিতে। টাকার অঙ্কে যে জীবনের মূল্য মাপা যায় না, তা প্রমাণ করল সেখানে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের চোখ।
১৫ বছরের অভিজ্ঞতা বনাম এক মুহূর্তের নিয়তি: ৩০ বছর বয়সী রুনা খাতুন এসেছিলেন তাঁর দুই বছরের অবুঝ শিশুকে কোলে নিয়ে। তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হলো পাঁচ লক্ষ টাকার একটি চেক। ঠিক এক বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান তাঁর পেশাদার চালক স্বামী। রুনা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, "১৫ বছরের ড্রাইভিং অভিজ্ঞতাও উনাকে বাঁচাতে পারল না। এই টাকা দিয়ে এখন আমি কী করব? আমি তো আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটাই হারিয়ে ফেলেছি।" রুনার এখন একমাত্র লক্ষ্য পিতৃহীন সন্তানকে কোনোমতে মানুষ করা। কিন্তু স্বামীর শূন্যতা আর এই চেকে ঢাকা পড়বে না।
নব্বই বছরের পিতার অবিনাশী শোক: বয়সের ভারে নুয়ে পড়া নব্বই ঊর্ধ্ব বৃদ্ধ তুলা শেখ। এই বয়সে যেখানে সন্তানের কাঁধে ভর দিয়ে তাঁর চলার কথা, সেখানে তিনি এসেছেন তাঁর আদরের ধনকে হারানোর পর অনুদান নিতে। এক বছর আগে এক ব্যস্ত রাস্তা পার হতে গিয়ে পিষ্ট হয়েছিল তাঁর সন্তানের প্রাণ। বৃদ্ধ বাবার কাছে এই অনুদানের অর্থ তাঁর সন্তানের স্মৃতির এক টুকরো করুণ স্মারক মাত্র। চেকটি হাতে নিয়ে কাঁপতি গলায় তিনি বললেন, "আমার যাওয়ার বয়স হয়েছিল, কিন্তু চলে গেল ছেলেটা। এমন দুর্ঘটনা যেন আর কোনো বাবার জীবনে কখনো না আসে।"
মহাসড়কের সেই অভিশপ্ত মুহূর্ত: চল্লিশ বছর বয়সী জীবন প্রসাদ যখন ক্রাচে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, হলরুমের সবাই তখন স্তব্ধ। মহাসড়কে এক অটোরিকশা দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীকে। সেই অভিশপ্ত মুহূর্তে তিনি নিজেও একই অটোরিকশার যাত্রী ছিলেন। নিজের শারীরিক পঙ্গুত্ব আর চোখের সামনে স্ত্রীর চলে যাওয়ার সেই বীভৎস দৃশ্য আজো তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়। জীবন প্রসাদের কাছে এই অনুদান স্ত্রীর জীবনের বিনিময়ে এক অপূরণীয় সান্ত্বনা ছাড়া আর কিছুই নয়।
কর্মক্ষম হাত থেকে কর্মহীন অন্ধকারের গল্প:
৪৮ বছরের মোঃ সোনু মিয়া ছিলেন ঢাকার কাওরান বাজারের এক ব্যস্ত আড়তের দিনমজুর। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ভোর ৫টায় কাজে বেরিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু একটি ঘাতক ট্রাকের চাকা তাঁর জীবনের চাকা থামিয়ে দেয়, কেড়ে নেয় একটি পা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি আজ সম্পূর্ণ অচল। সালাম তাঁর দুই ছোট ছোট সন্তানের কথা ভেবে শিউরে ওঠেন, "আমার তো একটা পা চলে গেল, কিন্তু আমার এই অবুঝ বাচ্চা দুটোর ভবিষ্যৎ কী? ওদের কে দেখবে?" এই প্রশ্নের উত্তর কোনো চেকে লেখা থাকে ন|
উপরের চারটি ঘটনা ভিন্ন হলেও সবগুলো আসলে এক সুতোয় গাঁথা—যার নাম সড়ক দুর্ঘটনা। সত্যিকার অর্থে যারা এই ভয়াবহতার শিকার হন, কেবল তারাই এর গভীরতা উপলব্ধি করতে পারেন। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের এই দুঃখের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন অনুষ্ঠানের সভাপতি গাজীপুর জেলার সম্মানিত জেলা প্রশাসক জনাব মো: নূরুল করিম ভূঁইয়া।
সভাপতির বক্তব্যে তিনি এক ভিন্নধর্মী তুলনা টেনে আনেন। তিনি বলেন, "পশ্চিমা বিশ্বে যদি একটি হরিণ বা একঝাঁক হাঁসও রাস্তা পার হয়, তবে হাইওয়ের সমস্ত গাড়ি লাইনে দাঁড়িয়ে যায়। আমাদের দেশে চালকদের এই ধৈর্যের বড্ড অভাব।" তিনি মহাসড়কের বর্তমান বিশৃঙ্খলার কথা উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে কম গতির অটোরিকশা বা সাইকেলগুলো হাইওয়েতে বড় বড় দ্রুতগামী গাড়ির সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে নিজেদের বিপদ ডেকে আনছে। একটি বিজ্ঞাপনের সূত্র ধরে তিনি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন, "জীবনটা অনেক ছোট, কিন্তু এই জীবনের হেফাজতের দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই।"
মহাসড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ফেরাতে জেলা প্রশাসক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুসংবাদ ও পদক্ষেপের কথা জানান:
১. গাজীপুর জেলার মহাসড়ক সংলগ্ন হকারদের অন্যত্র পুনর্বাসন করা হবে।
২. বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রয়োজনীয় বাইপাস সড়ক চালু করা হবে।
৩. হাইওয়েতে হুটহাট শ্রমিক আন্দোলনের সংস্কৃতি বন্ধে এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে শ্রমিকদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি গ্রহণের মতো ফলপ্রসূ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপার জনাব মো: শরিফ উদ্দীন, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এস এম আশরাফুল আলম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব সালমা খাতুন সহ জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকবৃন্দ, এনজিও কর্মী ও অন্যান্য সুধীবৃন্দ। সমবেত সকলেই একবাক্যে নিরাপদ সড়ক পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের অঙ্গীকার করেন।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো প্রশাসনের এই মানবিক সহায়তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানালেও, তাঁদের চোখের কোণের জল আর দীর্ঘশ্বাস একটি বার্তাই দিয়ে গেল—রাস্তা যেন আর কোনো প্রাণ না কেড়ে নেয়, কোনো পরিবারকে যেন আর এভাবে অনুদানের চেক নিতে লাইনে দাঁড়াতে না হয়।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.