চার বিয়ে সুন্নত? নাকি সমাজের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় বিভ্রান্তি
জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
ধর্মীয় আলোচনায় এমন কিছু বিষয় রয়েছে, যেগুলো যতটা আলোচিত, তার চেয়ে অনেক বেশি অপব্যাখ্যাত। ইসলামে একাধিক বিয়ার বিধান তার অন্যতম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে জনপরিসরের নানা বক্তৃতায় প্রায়ই এমন ধারণা প্রচার করা হয় যে, চারটি বিয়া করা সুন্নত, বরং এটি যেন একজন ধার্মিক পুরুষের বিশেষ মর্যাদার পরিচয়। অথচ কুরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামী আইনশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা এই ধারণাকে সমর্থন করে না।
প্রথমেই একটি মৌলিক সত্য স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন ইসলামে বিবাহ সুন্নত, কিন্তু চারটি বিয়া সুন্নত নয়। রাসূলুল্লাহ সা. বিবাহকে তাঁর সুন্নত হিসেবে ঘোষণা করেছেন, কিন্তু কোথাও চারটি বিয়া করাকে সুন্নত হিসেবে ঘোষণা করেননি। এই দুটির মধ্যে পার্থক্য না করায় সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
কুরআন পুরুষকে সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে, তবে সেই অনুমতির সঙ্গে এমন একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে, যা অধিকাংশ আলোচনায় ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, যদি ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা থাকে, তাহলে একজন স্ত্রীই যথেষ্ট। অর্থাৎ ইসলামের মূল বক্তব্য সংখ্যা নয়, ন্যায়বিচার। অনুমতি নয়, দায়িত্ব। অধিকার নয়, জবাবদিহি।
এই আয়াতের অবতীর্ণ হওয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। উহুদের যুদ্ধে বহু মুসলিম শহীদ হওয়ার পর মদিনায় অসংখ্য নারী বিধবা হন এবং বহু শিশু পিতৃহীন হয়ে পড়ে। সমাজে তখন এমন এক মানবিক সংকট তৈরি হয়, যেখানে নারীদের নিরাপত্তা, সম্মান, ভরণপোষণ ও সামাজিক স্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতায় ইসলাম সীমাহীন বহুবিবাহের প্রচলিত আরব প্রথাকে নিয়ন্ত্রণ করে সর্বোচ্চ চারজন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করে এবং তার সঙ্গে ন্যায়বিচারের কঠোর শর্ত আরোপ করে। সুতরাং একাধিক বিয়ার অনুমতি ছিল একটি সামাজিক দায়িত্ব পালনের পথ, প্রবৃত্তির অবাধ বৈধতা নয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সমাজে এই বিধানকে প্রায়ই তার মূল দর্শন থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল পুরুষের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বিশেষ করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সামাজিকভাবে দুর্বল কিংবা নিজের কন্যার বয়সী কোনো তরুণীকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে কেউ যদি এটিকে 'সুন্নত' পালনের ভাষ্য দেন, তাহলে তা ইসলামের নৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসলাম কখনো মানুষের দুর্বলতাকে ভোগের সুযোগে পরিণত করার শিক্ষা দেয়নি, বরং দুর্বল মানুষের অধিকার সংরক্ষণকেই ধর্মীয় দায়িত্বে পরিণত করেছে।
ইসলামী আইনশাস্ত্রে একাধিক বিয়া কোনো একরৈখিক বিধান নয়। ইমাম নববী রহ., ইমাম ইবনু কুদামাহ রহ., ইমাম কুরতুবী রহ. এবং ইমাম ইবন কাসীর রহ.-এর আলোচনায় স্পষ্ট যে, একাধিক বিয়ার বিধান ব্যক্তির সামর্থ্য, প্রয়োজন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। কোথাও তা বৈধ, কোথাও তা কল্যাণকর হতে পারে, আবার কোথাও তা অপছন্দনীয় কিংবা অন্যায়ের আশঙ্কা থাকলে নিষিদ্ধের পর্যায়েও পৌঁছাতে পারে। অতএব, একাধিক বিয়াকে সর্বাবস্থায় সুন্নত হিসেবে উপস্থাপন করা ফিকহের প্রতিষ্ঠিত নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
রাসূলুল্লাহ সা. কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন যে ব্যক্তি একাধিক স্ত্রীর মধ্যে ন্যায়বিচার করবে না, কিয়ামতের দিন সে বিকলাঙ্গ ও লাঞ্ছিত অবস্থায় উপস্থিত হবে। এই হাদিস একাধিক বিয়ার অনুমতির চেয়ে তার দায়িত্ব ও জবাবদিহিকেই অধিক গুরুত্ব দিয়েছে।
অনেকেই আবার রাসূলুল্লাহ সা.-এর একাধিক বিবাহকে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার পক্ষে দলিল হিসেবে ব্যবহার করেন। অথচ এটি ইতিহাসের অসম্পূর্ণ পাঠ। তাঁর অধিকাংশ বিবাহ ছিল বিধবা নারীদের আশ্রয় প্রদান, বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করা, ইসলামী পারিবারিক বিধান বাস্তব জীবনে শিক্ষা দেওয়া এবং নবুয়তের দায়িত্ব পালনের বৃহত্তর প্রয়োজনে। উপরন্তু, চারজনের অধিক স্ত্রী রাখার অনুমতি ছিল তাঁর জন্য বিশেষ বিধান; যা সাধারণ মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য নয়। অতএব, নববী জীবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে সাধারণ বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা বৈজ্ঞানিক বা শরয়ি কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই গ্রহণযোগ্য নয়।
আজ আমাদের সমাজে একাধিক বিয়া নিয়ে দুটি বিপরীত প্রবণতা দেখা যায়। একদল এটিকে ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক বানাতে চান, আরেকদল ইসলামকে দোষারোপ করে পুরো বিধানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেন। বাস্তবে এই দুই অবস্থানই কুরআনের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচ্যুত। ইসলাম একাধিক বিয়াকে কখনো বাধ্যতামূলক করেনি, আবার অযৌক্তিকভাবেও নিষিদ্ধ করেনি। বরং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ বিবেচনায় একটি সীমিত, নিয়ন্ত্রিত এবং জবাবদিহিমূলক অনুমতি দিয়েছে।
ইসলামের পরিবারব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু সংখ্যা নয়, ন্যায়বিচার, অধিকার নয়, দায়িত্ব, প্রবৃত্তি নয়, তাকওয়া। তাই চারটি বিয়া করাকে ধর্মীয় কৃতিত্ব হিসেবে প্রচার করা যেমন বিভ্রান্তিকর, তেমনি ইসলামের এই শর্তসাপেক্ষ বিধানকে নারীবিদ্বেষের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করাও ইতিহাস ও শরিয়ত উভয়ের প্রতিই অবিচার। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা হলো, যে সম্পর্ক ন্যায়বিচার, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করে, কেবল সেই সম্পর্কই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য। আর যেখানে ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নেই, সেখানে কুরআনের নির্দেশ আজও একই একজনই যথেষ্ট।
লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর
mdraiyan6790@gmail.com
+8801871194102
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.