কুড়িগ্রামে সোনাহাট সেতুর পাটাতন ভেঙে ভারী যান চলাচল বন্ধ
সোনাহাট স্থলবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যাহত
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় দুধকুমার নদের ওপর নির্মিত শতবর্ষী সোনাহাট লোহার সেতুর স্টিলের পাটাতন ভেঙে যাওয়ায় বুধবার সকাল ১০টা থেকে সেতুটির ওপর দিয়ে সব ধরনের ভারী যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। একটি বালুবাহী ট্রাক সেতু পার হওয়ার সময় অতিরিক্ত চাপে পাটাতন ভেঙে গেলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ট্রাকটি কোনোভাবে সেতু অতিক্রম করলেও পরে নিরাপত্তার স্বার্থে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এর ফলে সোনাহাট স্থলবন্দরগামী ও সেখান থেকে আসা শত শত পণ্যবাহী ট্রাক, বাস, পিকআপ ও অন্যান্য যানবাহন সেতুর দুই প্রান্তে আটকা পড়ে। এতে স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বহুদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে সোনাহাট লোহার সেতু। সেতুর বিভিন্ন স্থানে স্টিলের পাটাতন ক্ষতিগ্রস্ত, কোথাও কোথাও লোহার প্লেট (ডেক প্লেট) খুলে গেছে। তারপরও বিকল্প সেতু চালু না হওয়ায় প্রতিদিন শত শত ভারী যানবাহন জীবনঝুঁকি নিয়ে এ সেতুর ওপর দিয়েই চলাচল করছে।
সোনাহাট স্থলবন্দরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হওয়ায় প্রতিদিন ভারত থেকে আমদানি এবং বাংলাদেশ থেকে রপ্তানিকৃত পণ্যবাহী শতাধিক ট্রাক এই সেতু ব্যবহার করে। ফলে সামান্য ত্রুটিতেই পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।
স্থানীয় সূত্র ও সড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৮৭ সালে লালমনিরহাট থেকে ভারতের গৌহাটি পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের অংশ হিসেবে দুধকুমার নদের ওপর প্রায় ১ হাজার ২০০ ফুট দীর্ঘ সোনাহাট রেলসেতু নির্মাণ করা হয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সেতুর একটি অংশ ধ্বংস করা হয়।
স্বাধীনতার পর সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে সেতুটি সংস্কার করে রেলসেতুকে সড়কসেতু হিসেবে ব্যবহার উপযোগী করা হয়। এরপর থেকে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলের তিনটি ইউনিয়ন, কচাকাটা ও জামালপুরের মাদারগঞ্জ এলাকার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এটি।
নির্মাণকালে সেতুটির আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছিল ১০০ বছর। সেই হিসেবে প্রায় চার দশক আগেই এর নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত ভারী যানবাহনের চাপ বহন করতে গিয়ে সেতুটি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঝুঁকিপূর্ণ এই লোহার সেতুর পাশেই দুধকুমার নদের দক্ষিণাংশে ১৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৪৫ মিটার দীর্ঘ নতুন সোনাহাট সেতুর নির্মাণকাজ চলছে। প্রকল্পটি দুই বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আট বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। এতে স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে।
স্থানীয়দের দাবি, নতুন সেতুটি দ্রুত চালু করা না হলে পুরোনো সেতু যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে সোনাহাট স্থলবন্দরের কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সোনাহাট এলাকার বাসিন্দা মেহেরুল আলম বলেন, "পাথর ও বালুবোঝাই ট্রাক সেতুর ওপর উঠলেই পুরো সেতু থরথর করে কেঁপে ওঠে। সেতুটি এতটাই সরু যে একটি ট্রাক চলাচলের সময় বিপরীত দিক থেকে অন্য কোনো যানবাহন যেতে পারে না। ফলে প্রায়ই দুই পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়।"
তিনি বলেন, "পাশেই নতুন সেতুর নির্মাণকাজ আট বছর ধরে চলছে। দুই বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো কাজ শেষ হয়নি। নির্মাণকাজের ধীরগতিতে মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।"
সোনাহাট স্থলবন্দরের ট্রাকচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, "প্রতিদিনই পণ্যবোঝাই ট্রাক নিয়ে এই সেতু পার হতে হয়। ট্রাক নিয়ে সেতুর ওপর উঠলেই দুর্ঘটনার ভয় কাজ করে।"
তিনি আরও বলেন, "প্রায় প্রতি মাসেই সেতুর পাটাতন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কখনো কখনো মাসে তিন-চারবারও এমন ঘটনা ঘটে। প্রতিবারই ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। বুধবার সকাল থেকেও পণ্যবোঝাই ট্রাক নিয়ে সেতুর পাশে আটকে আছি।"
সোনাহাট স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ী আবু মোস্তফা বলেন, "প্রায়ই সেতুর পাটাতন ভেঙে যায়, পরে সড়ক বিভাগ তা মেরামত করে। কিন্তু স্থায়ী সমাধান না থাকায় পণ্যবাহী যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।"
তিনি বলেন, "নতুন সেতুর নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং স্থায়ীভাবে এই সংকটের সমাধান হবে।"
ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃত দেবনাথ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পাটাতন দ্রুত সংস্কারের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগকে জানানো হয়েছে। অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যানবাহনের কারণে প্রায়ই সেতুর পাটাতন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই ওভারলোড যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুড়িগ্রাম সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মীর নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পাটাতন মেরামতের জন্য কারিগরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করেছে। যত দ্রুত সম্ভব সংস্কারকাজ শেষ করে যান চলাচল স্বাভাবিক করা হবে।
তিনি বলেন, "পুরোনো লোহার সেতুর পাশের নতুন সেতুর নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। চলতি বছরের মধ্যেই নির্মাণ সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। নতুন সেতু চালু হলে সব ধরনের যানবাহন নিরাপদে চলাচল করতে পারবে এবং দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হবে।"
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.