কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্রপাড়ে চার শিক্ষকের একজনও আসেননি বিদ্যালয়ে
দিনভর তালাবদ্ধ শ্রেণিকক্ষ, জাতীয় পতাকাও ওঠেনি
তালা ভাঙার চেষ্টা করে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ।
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার।
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদবিচ্ছিন্ন দ্বীপচর ‘ঝুনকার চর’। বিস্তীর্ণ এই চরের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার একমাত্র প্রতিষ্ঠান খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু শিক্ষকদের নিয়মিত অনুপস্থিতি, দেরিতে বিদ্যালয়ে আসা এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিষ্ঠানটির পাঠদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জোড়াতালি দিয়ে চলছে বিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম।
সোমবার পরিস্থিতি যেন সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। বিদ্যালয়ের চার শিক্ষকের একজনও সেদিন বিদ্যালয়ে উপস্থিত হননি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলো তালাবদ্ধ ছিল। বিদ্যালয়ে ওঠেনি জাতীয় পতাকাও। ফলে দূর-দূরান্তের চর থেকে বিদ্যালয়ে এসে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে হয়।
স্থানীয়রা জানান, বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৭৮ জন শিক্ষার্থী এবং চারজন শিক্ষক রয়েছেন। চার শিক্ষকই মূল ভূখণ্ড থেকে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় প্রতিদিনই অন্তত একজন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকেন। যারা বিদ্যালয়ে আসেন, তাদের কেউ কেউ নির্ধারিত সময়ের পর বিদ্যালয়ে পৌঁছান। এতে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং চরের দরিদ্র পরিবারের শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সোমবার সকাল ১০টার আগেই প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে এসে হাজির হয়। শিক্ষক আসবেন—এই আশায় তারা দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু কোনো শিক্ষক না আসায় একপর্যায়ে অনেক শিশু বাড়ি ফিরে যায়। কয়েকজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের বারান্দায় বসেই অপেক্ষা করতে থাকে।
দুপুরের আগে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও বিদ্যালয়ে আসে। এসে দেখে শ্রেণিকক্ষের দরজায় তালা। শিক্ষকও নেই। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়। তারা চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলে বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা সেখানে ছুটে আসেন।
অভিভাবকেরা এসে দেখেন, বিদ্যালয়ের সব শ্রেণিকক্ষ তালাবদ্ধ এবং কোনো শিক্ষকই উপস্থিত নেই। পরে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের তালা ভাঙার চেষ্টা করে বিক্ষোভ শুরু করে। তবে অভিভাবকেরা তাদের বাধা দেন। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যালয়ে অপেক্ষা করলেও কোনো শিক্ষক সেখানে আসেননি বলে তারা জানান।
শিক্ষকদের অনুপস্থিতির কারণে শুধু পাঠদানই বন্ধ থাকেনি, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সরকার নির্ধারিত ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচির খাবার থেকেও বঞ্চিত হয়েছে।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম বলে, ‘আগে প্রতিদিন একজন অথবা দুজন শিক্ষক অনুপস্থিত থাকতেন। যারা আসেন, তারাও দেরিতে আসেন। ঠিকমতো পড়াশোনা হয় না। তারপরও আমরা বিদ্যালয়ে আসি, কারণ এই চরে পড়াশোনা করার মতো আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই।’
সোমবারের ঘটনা উল্লেখ করে সে বলে, ‘আজ কোনো শিক্ষকই আসেননি। শ্রেণিকক্ষের তালাও খোলা হয়নি। আমরা মিড-ডে মিলের খাবারও পাইনি।’
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী শিউলি আক্তার বলে, ‘আমরা বিদ্যালয়ে আসার আগেই প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এসে বসেছিল। তারা দীর্ঘ সময় শিক্ষকদের জন্য অপেক্ষা করেছে। পরে আমরাও অপেক্ষা করি। দুপুর পর্যন্ত কোনো শিক্ষক না আসায় আমরা তালা ভাঙার চেষ্টা করি। তবে অভিভাবকেরা বাধা দেওয়ায় তালা ভাঙিনি। পরে শিক্ষকদের অনিয়মের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করি।’
বিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমানে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র আল-আমিনের অভিযোগ, ২০১৬ সালে বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার পরিবেশের অবনতি শুরু হয়।
তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে প্রশাসন ও শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কার্যকর কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।’
আল-আমিনের দাবি, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার নেতৃত্বে বিদ্যালয়টিতে তদন্ত করা হয় এবং অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া যায়। কিন্তু এরপরও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘এই বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান হচ্ছে না। শিক্ষকরা নিজেদের ইচ্ছামতো বিদ্যালয়ে আসেন এবং চলে যান। অথচ এই চরের শিশুদের শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়টি ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষক সংকট নয়, এখানে মূল সমস্যা হচ্ছে দায়িত্ব পালনে অনীহা ও জবাবদিহির অভাব।’
শিক্ষার্থীর অভিভাবক দবিয়ার রহমান বলেন, ‘শিশুদের চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে আমরা বিদ্যালয়ে এসে দেখি শ্রেণিকক্ষের দরজায় তালা। কোনো শিক্ষক নেই। এমনকি জাতীয় পতাকাও উত্তোলন করা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘আগেও শিক্ষকদের অনিয়মের কথা শুনেছি। কিন্তু সোমবারের ঘটনা আগের সব অনিয়মকে ছাড়িয়ে গেছে। এই চরে যদি সন্তানদের পড়াশোনার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা থাকত, তাহলে আমরা তাদের এই বিদ্যালয়ে পাঠাতাম না।’
তার ভাষ্য, চরের মানুষের জন্য বিদ্যালয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষকরা নিয়মিত না এলে দরিদ্র ও দুর্গম এলাকার শিশুদের শিক্ষাজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অভিযোগের বিষয়ে খেওয়ার আলগার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইশরাত জাহানের সঙ্গে কথা বলার জন্য তার ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে সোমবার চার শিক্ষকই কেন বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত ছিলেন, সে বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন কমিটির সমন্বয়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। শিক্ষার্থীদের প্রতি এমন অবহেলা অত্যন্ত দুঃখজনক। কিছু শিক্ষকের দায়িত্বহীনতার কারণে চরের শিশুরা শিক্ষার ক্ষেত্রে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘চরের শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করতে হবে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি তদন্ত করে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোবাশ্বের আলী বলেন, ‘সোমবার বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষকই উপস্থিত ছিলেন না। বিষয়টি আমরা জেনেছি। দায়িত্বে অবহেলার কারণে চার শিক্ষককেই কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জোর সুপারিশ করা হবে।’
কুড়িগ্রাম জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনাটি জানার পরপরই অভিযুক্ত শিক্ষকদের শোকজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত ও বিধি অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের উপস্থিতি, নিয়মিত পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো হবে।’
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.