কুড়িগ্রামে একই পরিবারের ৬ সদস্যই মানসিক রোগী, অভাব ও অসুস্থতায় কাটছে মানবেতর জীবন
আরমান হোসেন রাজু
রংপুর বিভাগীয় ক্রাইম রিপোর্টার
০১৭১৭৭৭৬৯৭২
কুড়িগ্রামের রাজারহাটে জরাজীর্ণ একটি ঘরে চরম অভাব, অসুস্থতা আর চিকিৎসার অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ছয় সদস্যের একটি পরিবার। পরিবারের প্রধান স্বামী-স্ত্রীসহ চার সন্তানের সকলেই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। পরিবারটিতে নেই কোনো উপার্জনক্ষম সদস্য, নিজস্ব জমি কিংবা স্থায়ী আয়ের উৎস। এমন পরিস্থিতিতে অসুস্থ শরীর নিয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করা ৫৫ বছর বয়সী দোলেনা বেগমই এখন পুরো পরিবারের একমাত্র ভরসা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের গাবুর হেলান গ্রামের এই পরিবারটির প্রধান রঞ্জন (৬৫), তার স্ত্রী দোলেনা বেগম (৫৫) এবং তাদের চার সন্তান—রনজি খাতুন (৩০), দেলোয়ার (২৩), অধিফা খাতুন (২০) ও দানিয়েল (১৭)।
পরিবারের সদস্যরা জানান, রঞ্জন জন্ম থেকেই মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন এবং স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘রঞ্জন পাগলা’ নামে পরিচিত। বর্তমানে তার স্ত্রী ও চার সন্তানও একই ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। ফলে পরিবারের ছয়জন সদস্যের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে কাজ করে আয়-রোজগার করার মতো কেউ নেই।
বাস্তুভিটাহীন এই পরিবারের একমাত্র আশ্রয় অন্যের জমিতে গড়ে তোলা একটি জরাজীর্ণ ঘর। সেখানে একদিকে যেমন পর্যাপ্ত খাবার জোটে না, অন্যদিকে সামর্থ্য না থাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও বন্ধ রয়েছে। অসুস্থতার পাশাপাশি চরম দারিদ্র্য তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। দিনের বড় একটি অংশ কাটে তাদের নিজেদের মধ্যকার ঝগড়া-বিবাদ ও নানা অস্বাভাবিক আচরণের মধ্য দিয়ে।
পরিবারটির বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি ধকল সামলাতে হচ্ছে দোলেনা বেগমকে। নিজের অসুস্থতা সত্ত্বেও সংসারের চাকা সচল রাখতে তিনি অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। দিন শেষে প্রাপ্ত সামান্য মজুরি দিয়ে ছয়জনের মুখে খাবার তুলে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে তিন মাস পরপর পাওয়া সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতার অর্থ যোগ হলেও অভাবের তাড়না দূর হচ্ছে না।
দীর্ঘদিনের অমানবিক দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে দোলেনা বেগম আকুতি জানিয়ে বলেন, “গরিব ঘরের সন্তান আমি। পরিবার এক পাগলা মানুষের সঙ্গে বিয়ে দিছিল। স্বামী কোনো কাজ করতে পারে না। অনেক কষ্ট করে চারটা সন্তানকে বড় করেছি, কিন্তু ওরা সবাই অসুস্থ। ঠিকমতো খাইতে পারি না, খুব কষ্টে দিন কাটছে আমাদের।”
পরিবারটির সহায়তার বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ববিতা খাতুন জানান, পরিবারের সব সদস্যকেই ইতোমধ্যে সরকারি ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে সরকারিভাবে নতুন কোনো সুযোগ-সুবিধা বা সহায়তা এলে তা তাদের প্রদান করা হবে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, “পরিবারটির বিষয়ে আমি আগে অবগত ছিলাম না। তারা হাসপাতালে যোগাযোগ করলে বা আসলে চিকিৎসার বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, পরিবারটির সদস্যদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার এবং একটি নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। দ্রুত সরকারি বা সরকারি-বেসরকারি মানবিক সহায়তা না পেলে এই পরিবারটির দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তির পথ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.