কালুরঘাট সেতু ইতিহাসের সাক্ষী, অবহেলারও প্রতীক: মোস্তানছিরুল হক চৌধুরী
একটি সেতু কখনো শুধু ইট, পাথর, লোহা কিংবা কংক্রিটের সমষ্টি নয়; একটি সেতু মানুষের জীবন, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। একটি সেতু এক প্রান্তের মানুষকে অন্য প্রান্তের সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি সম্ভাবনার নতুন দুয়ারও খুলে দেয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের কাছে কালুরঘাট সেতু ঠিক তেমনই একটি প্রতীক। এটি যেমন ইতিহাসের গৌরবময় সাক্ষী, তেমনি দীর্ঘদিনের অবহেলা, উন্নয়ন বৈষম্য এবং অপূর্ণ প্রতিশ্রুতিরও নীরব সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
আমি দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার সন্তান। আমার শৈশব, কৈশোর এবং বেড়ে ওঠার স্মৃতির সঙ্গে কালুরঘাট সেতুর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। ছোটবেলায় অসংখ্যবার এই সেতু পার হয়েছি কখনো পরিবারের সঙ্গে, কখনো শিক্ষার উদ্দেশ্যে, কখনো সামাজিক কিংবা সাংগঠনিক কাজে। প্রতিবারই দেখেছি দীর্ঘ যানজট, মানুষের অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা এবং দুর্ভোগ। সময়ের সঙ্গে দেশের অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু কালুরঘাট সেতুকে ঘিরে মানুষের ভোগান্তি যেন একই জায়গায় রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত। পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, অসংখ্য চার ও ছয় লেনের মহাসড়ক এসব অবকাঠামো দেশের সক্ষমতার প্রমাণ বহন করছে। কিন্তু সেই উন্নয়নের ধারার মধ্যেও দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের বহু প্রতীক্ষিত আধুনিক কালুরঘাট সেতুর স্বপ্ন এখনও বাস্তবে রূপ পায়নি। ফলে এই অঞ্চলের লাখো মানুষ প্রতিদিন পুরোনো সংকটের মধ্য দিয়েই জীবনযাপন করছেন।
কালুরঘাট সেতুর গুরুত্ব বোঝার জন্য দক্ষিণ চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বোঝা জরুরি। বোয়ালখালী, পটিয়া, রাঙ্গুনিয়া, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া এবং কক্সবাজারমুখী মানুষের জন্য এই পথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে এই সেতু ব্যবহার করেন। এটি শুধু একটি সড়ক নয়, বরং দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের অন্যতম প্রধান সংযোগপথ।
দুঃখজনক হলেও সত্য, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই সেতু আজকের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। একই কাঠামো দিয়ে রেল ও সড়ক চলাচল, সংকীর্ণ প্রস্থ, পুরোনো অবকাঠামো এবং যানবাহনের ক্রমবর্ধমান চাপ প্রতিনিয়ত মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলছে। রেল চলাচলের সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানবাহন আটকে থাকে। সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট, নষ্ট হয় মূল্যবান কর্মঘণ্টা এবং ব্যাহত হয় জরুরি সেবাও।
এই দুর্ভোগের বাস্তব চিত্র প্রতিদিন দেখা যায়। একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে দেরি করে, একজন রোগী জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন, একজন কৃষক সময়মতো বাজারে পণ্য পৌঁছাতে পারেন না, একজন শ্রমিক কর্মস্থলে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন। একটি সেতুর সীমাবদ্ধতা কীভাবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে, কালুরঘাট তার বাস্তব উদাহরণ।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও কালুরঘাট সেতুর গুরুত্ব অপরিসীম। দক্ষিণ চট্টগ্রাম কৃষি, মৎস্য, লবণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পর্যটনের জন্য সম্ভাবনাময় অঞ্চল। উন্নত যোগাযোগ নিশ্চিত হলে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে, পরিবহন ব্যয় কমবে, শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একটি আধুনিক সেতু পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর, কর্ণফুলী নদীকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চল এবং বঙ্গবন্ধু টানেলের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্যও আধুনিক কালুরঘাট সেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রামের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করতে এই সেতুর বিকল্প নেই।
একটি আধুনিক সেতু নির্মিত হলে শুধু যানবাহনের গতি বাড়বে না; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন এবং সামাজিক উন্নয়নের নতুন দিগন্তও উন্মোচিত হবে। শিক্ষার্থীরা নিরাপদ ও সময়মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারবে, রোগীরা দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাবেন, ব্যবসায়ীরা কম সময়ে পণ্য পরিবহন করতে পারবেন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।
বর্তমান বিশ্বে যোগাযোগ অবকাঠামোই উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। যে অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা যত উন্নত, সেই অঞ্চলের বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও তত বেশি। তাই কালুরঘাটে একটি আধুনিক সেতু নির্মাণ কেবল দক্ষিণ চট্টগ্রামের দাবি নয়; এটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
দীর্ঘদিন ধরে নতুন কালুরঘাট সেতু নির্মাণের নানা ঘোষণা এসেছে। সম্ভাব্যতা যাচাই, প্রকল্প প্রস্তাব, নকশা প্রণয়ন সবই হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের ধীরগতি মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। উন্নয়ন প্রকল্পের বিলম্ব মানে শুধু সময়ের অপচয় নয়; এর অর্থ অর্থনৈতিক ক্ষতি, উৎপাদনশীলতার হ্রাস এবং মানুষের দুর্ভোগকে দীর্ঘায়িত করা।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। তারা মানববন্ধন করেছেন, স্মারকলিপি দিয়েছেন, বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দাবি জানিয়েছেন। জনপ্রতিনিধিরাও বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু মানুষ এখন আর নতুন প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়।
উন্নয়নের সুফল রাজধানীকেন্দ্রিক হলে চলবে না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোও সমান সুযোগ পাবে এটাই একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষও সেই ন্যায্য অধিকার প্রত্যাশা করে। কালুরঘাট সেতুর উন্নয়ন সেই বৈষম্য দূর করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, অবকাঠামো উন্নয়ন কোনো রাজনৈতিক দয়া নয়; এটি জনগণের অধিকার। একটি নিরাপদ ও আধুনিক সেতু মানুষের জীবন রক্ষা করে, দুর্ঘটনা কমায়, অর্থনীতিকে গতিশীল করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি তৈরি করে।
আমি একজন দক্ষিণ চট্টগ্রামের সন্তান, একজন সচেতন নাগরিক এবং একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি কালুরঘাটে একটি আধুনিক, প্রশস্ত ও নিরাপদ সেতু নির্মাণ এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি সময়ের অপরিহার্য দাবি। আজ যে বিনিয়োগ করা হবে, তা আগামী কয়েক দশক ধরে দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, বাংলাদেশ রেলওয়ে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আমার আন্তরিক আহ্বান কালুরঘাট সেতু নির্মাণ প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। প্রকল্প যেন আর কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে; দৃশ্যমান কাজ শুরু হোক, যাতে মানুষ তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে দেখে।
আমাদের প্রজন্ম বহু প্রতিশ্রুতি শুনেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন আর প্রতিশ্রুতির ইতিহাস না পড়ে; তারা যেন উন্নয়নের বাস্তব ইতিহাসের অংশ হতে পারে। কালুরঘাট সেতু সেই ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে।
আজ সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। উন্নয়নের বাংলাদেশে কালুরঘাট সেতু আর অবহেলার প্রতীক হয়ে থাকবে কেন? দক্ষিণ চট্টগ্রামের লাখো মানুষের জীবন, জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ভবিষ্যৎ এই সেতুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই কালুরঘাটে একটি আধুনিক সেতু নির্মাণ শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি মানুষের ন্যায্য অধিকার, আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং টেকসই জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য অঙ্গ।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হোক। কালুরঘাট সেতুর নতুন নির্মাণ হোক উন্নয়নের নতুন অঙ্গীকার, সমতার নতুন দৃষ্টান্ত এবং আগামীর বাংলাদেশের এক উজ্জ্বল মাইলফলক।
লেখক: মোস্তানছিরুল হক চৌধুরী
যুগ্ম সদস্য সচিব, নাগরিক ছাত্র ঐক্য কেন্দ্রীয় সংসদ
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.