কাবুলিওয়ালা থেকে ডিজিটাল বিক্রয়কর্মী: অস্তিত্বের সংকট ও রূপান্তর -অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান -ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-
পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিকাশ, মানুষের সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং জীবিকার নির্মম তাগিদে যুগে যুগে মানুষ নানা পেশাকে বেছে নিয়েছে। তার মধ্যে ‘বিক্রয়কর্মী’ (Salesman) বা পণ্যের ফেরিওয়ালা চরিত্রটি কেবল একটি পেশার নাম নয়; বরং তা আধুনিক মানুষের একাকীত্ব, সংগ্রাম ও নৈতিক স্খলনের এক চিরন্তন দলিল। বিশ্ব সাহিত্য ও সেলুলয়েডের পর্দায় এই চরিত্রটি বারবার ঘুরেফিরে এসেছে—কখনও লোভের প্রতীক হিসেবে, কখনও বা মধ্যবিত্তের ক্ষয়িষ্ণু অস্তিত্ব রক্ষার শেষ হাতিয়ার হিসেবে। সুর করে ডাক দেওয়া গ্রামীণ ফেরিওয়ালা থেকে শুরু করে আজকের কোট-টাই পরা কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ কিংবা অদৃশ্য ডিজিটাল অ্যালগরিদম—বিক্রয়কর্মীর এই বিবর্তনের ইতিহাস আদতে মানব সভ্যতারই এক মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের গল্প।
বিশ্ব সাহিত্যে বিক্রয়কর্মীর জীবনকে সবচেয়ে নিখুঁত ও নির্মমভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন মার্কিন নাট্যকার আর্থার মিলার তাঁর কালজয়ী নাটক ‘ডেথ অব আ সেলসম্যান’ (Death of a Salesman)-এ। নাটকের প্রধান চরিত্র উইলি লোম্যান একজন বৃদ্ধ ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কর্মী, যে সারাজীবন ‘আমেরিকান ড্রিম’ বা বস্তুগত সফলতার পেছনে ছুটেছে। মিলার দেখিয়েছেন, পুঁজিবাদী সমাজ কীভাবে একজন মানুষকে তার যৌবনে নিংড়ে ব্যবহার করে এবং বয়স বাড়লে অবলীলায় ছুড়ে ফেলে দেয়। নিজের উপযোগিতা ফুরিয়ে যাওয়ার তীব্র মানসিক গ্লানি থেকে উইলি শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় সাহিত্যে ফ্রাঞ্জ কাফকা তাঁর রূপকধর্মী উপন্যাস ‘দ্য মেটামরফোসিস’ (The Metamorphosis)-এ একজন কাপড়ের ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কর্মী গ্রেগর সামসার যান্ত্রিক জীবনকে তুলে ধরেছেন। প্রতিদিন ভোরে ট্রেন ধরার তাড়া এবং বসের কড়া নজরদারি গ্রেগরকে মানসিকভাবে এমন এক পঙ্গুত্বে নিয়ে যায় যে, একদিন সকালে সে নিজেকে একটি বিশাল পোকাতে রূপান্তরিত অবস্থায় আবিষ্কার করে। কাফকা এখানে দেখিয়েছেন, যতক্ষণ মানুষ উপার্জনের যোগ্য থাকে, ততক্ষণই পরিবার ও সমাজে তার মূল্য; উৎপাদন ক্ষমতা হারালেই সে পরিণত হয় এক উপদ্রুত বোঝায়। এছাড়া সিনক্লেয়ার লুইসের ‘ব্যাবটি’ (Babbitt) এবং ডেভিড ম্যামেটের ‘গ্লেনগারি গ্লেন রস’ (Glengarry Glen Ross)-এর মতো সৃষ্টিগুলোতে বিক্রয় জগতের তীব্র প্রতিযোগিতা এবং মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলার গল্প চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
বইয়ের পাতা থেকে সিনেমার রূপালী পর্দায় এসে বিক্রয়কর্মীর জীবন আরও দৃশ্যমান ও জীবন্ত রূপ লাভ করেছে। ‘গ্লেনগারি গ্লেন রস’ (1992) চলচ্চিত্রে চারজন রিয়েল এস্টেট বিক্রয়কর্মীর চাকরি বাঁচানোর যে হাহাকার দেখানো হয়েছে, তা করপোরেট দুনিয়ার অন্ধকার দিকটিকে নগ্ন করে দেয়। আবার ক্রিস গার্ডনারের বাস্তব জীবন অবলম্বনে নির্মিত ‘দ্য পারসুট অব হ্যাপিনেস’ (2006) সিনেমাটি দেখায় এক গৃহহীন বাবা ও মেডিকেল স্ক্যানার বিক্রয়কর্মীর টিকে থাকার এক চরম ও অনুপ্রেরণাদায়ী মানবিক লড়াই।
ফিকশনের বাইরে ১৯৬৯ সালের বিখ্যাত তথ্যচিত্র ‘সেলসম্যান’ (Salesman)-এ চারজন ডোর-টু-ডোর বাইবেল বিক্রয়কর্মীর বাস্তব জীবনকে কোনো কৃত্রিমতা ছাড়াই ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছে, যা ঘরে ঘরে পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে অবহেলা, প্রত্যাখ্যান ও তীব্র অবসাদের এক অনন্য দলিল। অন্যদিকে ‘দ্য উলফ অব ওয়াল স্ট্রিট’ (2013) বা ‘সাকলার্স’ (2001)-এর মতো সিনেমাগুলো উন্মোচন করেছে শেয়ার বা গাড়ি বিক্রয়কর্মীদের লোভ, উম্মাদনা ও আগ্রাসী বিক্রয় কৌশলের নেপথ্য কথা।
বাঙালি সংস্কৃতিতে বিক্রয়কর্মীর রূপায়ণ পশ্চিমা বিশ্বের মতো অতটা করপোরেট না হলেও, তা অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ ও পারিবারিক আবেগে মোড়ানো। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা চরিত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কাবুলিওয়ালা’। দূর আফগানিস্তান থেকে আসা রহমতের হিং-বাদাম বিক্রির আড়ালে পণ্য বিক্রির চেয়ে একজন প্রবাসী পিতার পিতৃত্বের আকুলতাই প্রধান হয়ে উঠেছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বেদেনী’ বা ‘রাইকমল’-এর মতো গল্পে গ্রামীণ মেলা বা গ্রামে ঘুরে ঘুরে চুড়ি-ফিতে কিংবা কবিরাজি ওষুধ বিক্রি করা যাযাবর মানুষদের আদিম জীবনসংগ্রাম ও বাচনভঙ্গির জাদুকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বাংলা চলচ্চিত্রে বিক্রয় পেশার সবচেয়ে নিষ্ঠুর এবং বাস্তবসম্মত রূপায়ণ ঘটিয়েছেন সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘জন অরণ্য’ (1976) সিনেমায়। প্রধান চরিত্র সোমনাথ চাকরি না পেয়ে যখন ‘অর্ডার সাপ্লাই’ বা দালালি ব্যবসায় নামতে বাধ্য হয়, তখন তার চিরন্তন মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোক’ সংস্কৃতির পতন ঘটে। একটি বড় চুক্তি বা ‘সেলস’ সফল করতে তাকে তার ক্লায়েন্টের জন্য নারী সরবরাহ করতে হয়, যা তার ভেতরের সমস্ত নৈতিকতাকে গুঁড়িয়ে দেয়। আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ প্রচণ্ড গরমে টাই-বুট পরে পিঠে ভারী ব্যাগ নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা ‘মেডিকেল রিপ্রেজেন্টিটিভ’দের যে চিত্র এঁকেছেন, তা বাঙালি মধ্যবিত্তের আত্মসম্মান ও ক্ষুধার লড়াইয়ের এক বিষণ্ণ রূপ।
পাশ্চাত্য ও বাঙালি সাহিত্যের বিক্রয়কর্মী চরিত্রের তুলনা করলে পণ্য বিক্রির কৌশল এবং প্রতারণার ধরনের মধ্যে এক স্পষ্ট বিভাজন রেখা চোখে পড়ে। পাশ্চাত্যের সাহিত্যে প্রতারণাটি মূলত ‘কর্পোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক’। সেখানে Glengarry Glen Ross বা The Wolf of Wall- Street-এর কর্মীরা লোভের বশে, আগ্রাসী পিচিংয়ের মাধ্যমে বা কাগজের কারসাজিতে ক্রেতাকে সর্বস্বান্ত করে বড় বড় আর্থিক স্ক্যাম ঘটায়। বিপরীতে, বাঙালি চরিত্রের প্রতারণা বা চাতুর্য অধিকাংশ সময়ই প্রাতিষ্ঠানিক নয়, বরং তা ব্যক্তিগত ও অস্তিত্ব রক্ষার শেষ চেষ্টা। তারাশঙ্করের বেদেনী যখন সামান্য শিকড়-বাকড়কে ‘মহৌষধ’ বলে চতুর বাচনভঙ্গিতে বিক্রি করে, তা স্রেফ বেঁচে থাকার এক গ্রামীণ ছলনা। আর সত্যজিতের সোমনাথ যখন প্রতারণা বা অনৈতিকতার আশ্রয় নেয়, তা কোনো বড় গাড়ি বা বিলাসবহুল জীবনের লোভে নয়, বরং পুঁজিবাদী বাজারে স্রেফ টিকে থাকার স্বার্থে। পাশ্চাত্যের বিক্রয়কর্মী যেখানে পুঁজিবাদী লোভ ও সিস্টেমের প্রতীক, বাঙালি বিক্রয়কর্মী সেখানে মধ্যবিত্তের ক্ষয়িষ্ণু নৈতিকতা ও করুণ জীবনসংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতিনিধি।
সময়ের বিবর্তনে রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালার বাদাম-কিশমিশের ঝুলি কিংবা উইলি লোম্যানের ভারী সুটকেস আজ রূপান্তর ঘটেছে ল্যাপটপ, স্মার্টফোন আর অদৃশ্য কর্পোরেট টার্গেটে। আজকের বাজারে বিক্রয়কর্মীরা আর কেবল ‘সেলসম্যান’ নন; তারা এখন ‘বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার’ বা ‘অ্যাকাউন্ট এক্সিকিউটিভ’। ধুলোবালি মাখা রাস্তার বদলে তারা এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে বসেন ঠিকই, কিন্তু ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ট্র্যাকিং অ্যাপের নজরদারি এবং KPI (Key Performance Indicator)-এর জাঁতাকল তাদের জীবনকে এক আধুনিক যান্ত্রিক দাসত্বে পরিণত করেছে।
একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি এই পেশাকে নিয়ে গেছে আরও একধাপ অচেনা অধ্যায়ে—যা ‘ডিজিটাল সেলসম্যানশিপ’। আজকের দিনে সবচেয়ে বড় বিক্রেতা কোনো মানুষ নয়, বরং ফেসবুক বা অ্যামাজনের অদৃশ্য অ্যালগরিদম (Algorithm) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), যা ক্রেতার অজান্তেই তার মনস্তত্ত্ব হ্যাক করে পণ্য হাজির করছে। সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার বা কনটেন্ট ক্রিয়েটররা আজ নতুন যুগের ফেরিওয়ালা, যারা লাইভ স্ট্রিমিংয়ের কথার জাদুতে লাখ লাখ পণ্য বিক্রি করছেন। তবে এই ডিজিটাল রূপান্তরের সাথে সাথে প্রতারণার ধরনও বদলে গেছে। ভুয়া রিভিউ কেনা, হিডেন কস্ট (অদৃশ্য চার্জ), ক্লিকবেইট কিংবা ‘ফোমো’ (FOMO - Fear of Missing Out) তৈরি করে ক্রেতাকে অপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে বাধ্য করা আজ ডিজিটাল
সবচেয়ে বড় চাতুর্য।
কাল থেকে কালান্তরে বিক্রয়কর্মীর বহিরাঙ্গ বদলেছে, অ্যানালগ সুটকেস বদলে আজ ডিজিটাল স্ক্রিন হয়েছে, কিন্তু বদলায়নি তার ভেতরের আদিম মনস্তত্ত্ব ও নিয়তি। গতকাল যে বিক্রেতা হাটের ধুলোয় দাঁড়িয়ে কথার জাদুতে মানুষকে সম্মোহিত করতেন, আজ কর্পোরেট কেপিআই-এর চাপে কিংবা অ্যালগরিদমের আড়ালে বসে তিনিই ক্রেতার অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। বিক্রয় কৌশল হয়তো সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়েছে, কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নির্মম জাঁতাকলে পড়ে একজন বিক্রয়কর্মীর টিকে থাকার লড়াই, তার একাকীত্ব এবং নৈতিকতার অবক্ষয়ের মূল গল্পটি আজও অবিকল একই রয়ে গেছে।
থেকে ডিজিটাল বিক্রয়কর্মী: অস্তিত্বের সংকট ও রূপান্তর -অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান -ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-
পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিকাশ, মানুষের সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং জীবিকার নির্মম তাগিদে যুগে যুগে মানুষ নানা পেশাকে বেছে নিয়েছে। তার মধ্যে ‘বিক্রয়কর্মী’ (Salesman) বা পণ্যের ফেরিওয়ালা চরিত্রটি কেবল একটি পেশার নাম নয়; বরং তা আধুনিক মানুষের একাকীত্ব, সংগ্রাম ও নৈতিক স্খলনের এক চিরন্তন দলিল। বিশ্ব সাহিত্য ও সেলুলয়েডের পর্দায় এই চরিত্রটি বারবার ঘুরেফিরে এসেছে—কখনও লোভের প্রতীক হিসেবে, কখনও বা মধ্যবিত্তের ক্ষয়িষ্ণু অস্তিত্ব রক্ষার শেষ হাতিয়ার হিসেবে। সুর করে ডাক দেওয়া গ্রামীণ ফেরিওয়ালা থেকে শুরু করে আজকের কোট-টাই পরা কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ কিংবা অদৃশ্য ডিজিটাল অ্যালগরিদম—বিক্রয়কর্মীর এই বিবর্তনের ইতিহাস আদতে মানব সভ্যতারই এক মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের গল্প।
বিশ্ব সাহিত্যে বিক্রয়কর্মীর জীবনকে সবচেয়ে নিখুঁত ও নির্মমভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন মার্কিন নাট্যকার আর্থার মিলার তাঁর কালজয়ী নাটক ‘ডেথ অব আ সেলসম্যান’ (Death of a Salesman)-এ। নাটকের প্রধান চরিত্র উইলি লোম্যান একজন বৃদ্ধ ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কর্মী, যে সারাজীবন ‘আমেরিকান ড্রিম’ বা বস্তুগত সফলতার পেছনে ছুটেছে। মিলার দেখিয়েছেন, পুঁজিবাদী সমাজ কীভাবে একজন মানুষকে তার যৌবনে নিংড়ে ব্যবহার করে এবং বয়স বাড়লে অবলীলায় ছুড়ে ফেলে দেয়। নিজের উপযোগিতা ফুরিয়ে যাওয়ার তীব্র মানসিক গ্লানি থেকে উইলি শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় সাহিত্যে ফ্রাঞ্জ কাফকা তাঁর রূপকধর্মী উপন্যাস ‘দ্য মেটামরফোসিস’ (The Metamorphosis)-এ একজন কাপড়ের ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কর্মী গ্রেগর সামসার যান্ত্রিক জীবনকে তুলে ধরেছেন। প্রতিদিন ভোরে ট্রেন ধরার তাড়া এবং বসের কড়া নজরদারি গ্রেগরকে মানসিকভাবে এমন এক পঙ্গুত্বে নিয়ে যায় যে, একদিন সকালে সে নিজেকে একটি বিশাল পোকাতে রূপান্তরিত অবস্থায় আবিষ্কার করে। কাফকা এখানে দেখিয়েছেন, যতক্ষণ মানুষ উপার্জনের যোগ্য থাকে, ততক্ষণই পরিবার ও সমাজে তার মূল্য; উৎপাদন ক্ষমতা হারালেই সে পরিণত হয় এক উপদ্রুত বোঝায়। এছাড়া সিনক্লেয়ার লুইসের ‘ব্যাবটি’ (Babbitt) এবং ডেভিড ম্যামেটের ‘গ্লেনগারি গ্লেন রস’ (Glengarry Glen Ross)-এর মতো সৃষ্টিগুলোতে বিক্রয় জগতের তীব্র প্রতিযোগিতা এবং মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলার গল্প চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।
বইয়ের পাতা থেকে সিনেমার রূপালী পর্দায় এসে বিক্রয়কর্মীর জীবন আরও দৃশ্যমান ও জীবন্ত রূপ লাভ করেছে। ‘গ্লেনগারি গ্লেন রস’ (1992) চলচ্চিত্রে চারজন রিয়েল এস্টেট বিক্রয়কর্মীর চাকরি বাঁচানোর যে হাহাকার দেখানো হয়েছে, তা করপোরেট দুনিয়ার অন্ধকার দিকটিকে নগ্ন করে দেয়। আবার ক্রিস গার্ডনারের বাস্তব জীবন অবলম্বনে নির্মিত ‘দ্য পারসুট অব হ্যাপিনেস’ (2006) সিনেমাটি দেখায় এক গৃহহীন বাবা ও মেডিকেল স্ক্যানার বিক্রয়কর্মীর টিকে থাকার এক চরম ও অনুপ্রেরণাদায়ী মানবিক লড়াই।
ফিকশনের বাইরে ১৯৬৯ সালের বিখ্যাত তথ্যচিত্র ‘সেলসম্যান’ (Salesman)-এ চারজন ডোর-টু-ডোর বাইবেল বিক্রয়কর্মীর বাস্তব জীবনকে কোনো কৃত্রিমতা ছাড়াই ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছে, যা ঘরে ঘরে পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে অবহেলা, প্রত্যাখ্যান ও তীব্র অবসাদের এক অনন্য দলিল। অন্যদিকে ‘দ্য উলফ অব ওয়াল স্ট্রিট’ (2013) বা ‘সাকলার্স’ (2001)-এর মতো সিনেমাগুলো উন্মোচন করেছে শেয়ার বা গাড়ি বিক্রয়কর্মীদের লোভ, উম্মাদনা ও আগ্রাসী বিক্রয় কৌশলের নেপথ্য কথা।
বাঙালি সংস্কৃতিতে বিক্রয়কর্মীর রূপায়ণ পশ্চিমা বিশ্বের মতো অতটা করপোরেট না হলেও, তা অত্যন্ত জীবনঘনিষ্ঠ ও পারিবারিক আবেগে মোড়ানো। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা চরিত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কাবুলিওয়ালা’। দূর আফগানিস্তান থেকে আসা রহমতের হিং-বাদাম বিক্রির আড়ালে পণ্য বিক্রির চেয়ে একজন প্রবাসী পিতার পিতৃত্বের আকুলতাই প্রধান হয়ে উঠেছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বেদেনী’ বা ‘রাইকমল’-এর মতো গল্পে গ্রামীণ মেলা বা গ্রামে ঘুরে ঘুরে চুড়ি-ফিতে কিংবা কবিরাজি ওষুধ বিক্রি করা যাযাবর মানুষদের আদিম জীবনসংগ্রাম ও বাচনভঙ্গির জাদুকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
বাংলা চলচ্চিত্রে বিক্রয় পেশার সবচেয়ে নিষ্ঠুর এবং বাস্তবসম্মত রূপায়ণ ঘটিয়েছেন সত্যজিৎ রায় তাঁর ‘জন অরণ্য’ (1976) সিনেমায়। প্রধান চরিত্র সোমনাথ চাকরি না পেয়ে যখন ‘অর্ডার সাপ্লাই’ বা দালালি ব্যবসায় নামতে বাধ্য হয়, তখন তার চিরন্তন মধ্যবিত্ত ‘ভদ্রলোক’ সংস্কৃতির পতন ঘটে। একটি বড় চুক্তি বা ‘সেলস’ সফল করতে তাকে তার ক্লায়েন্টের জন্য নারী সরবরাহ করতে হয়, যা তার ভেতরের সমস্ত নৈতিকতাকে গুঁড়িয়ে দেয়। আধুনিক বাংলা কথাসাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ প্রচণ্ড গরমে টাই-বুট পরে পিঠে ভারী ব্যাগ নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা ‘মেডিকেল রিপ্রেজেন্টিটিভ’দের যে চিত্র এঁকেছেন, তা বাঙালি মধ্যবিত্তের আত্মসম্মান ও ক্ষুধার লড়াইয়ের এক বিষণ্ণ রূপ।
পাশ্চাত্য ও বাঙালি সাহিত্যের বিক্রয়কর্মী চরিত্রের তুলনা করলে পণ্য বিক্রির কৌশল এবং প্রতারণার ধরনের মধ্যে এক স্পষ্ট বিভাজন রেখা চোখে পড়ে। পাশ্চাত্যের সাহিত্যে প্রতারণাটি মূলত ‘কর্পোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক’। সেখানে Glengarry Glen Ross বা The Wolf of Wall- Street-এর কর্মীরা লোভের বশে, আগ্রাসী পিচিংয়ের মাধ্যমে বা কাগজের কারসাজিতে ক্রেতাকে সর্বস্বান্ত করে বড় বড় আর্থিক স্ক্যাম ঘটায়। বিপরীতে, বাঙালি চরিত্রের প্রতারণা বা চাতুর্য অধিকাংশ সময়ই প্রাতিষ্ঠানিক নয়, বরং তা ব্যক্তিগত ও অস্তিত্ব রক্ষার শেষ চেষ্টা। তারাশঙ্করের বেদেনী যখন সামান্য শিকড়-বাকড়কে ‘মহৌষধ’ বলে চতুর বাচনভঙ্গিতে বিক্রি করে, তা স্রেফ বেঁচে থাকার এক গ্রামীণ ছলনা। আর সত্যজিতের সোমনাথ যখন প্রতারণা বা অনৈতিকতার আশ্রয় নেয়, তা কোনো বড় গাড়ি বা বিলাসবহুল জীবনের লোভে নয়, বরং পুঁজিবাদী বাজারে স্রেফ টিকে থাকার স্বার্থে। পাশ্চাত্যের বিক্রয়কর্মী যেখানে পুঁজিবাদী লোভ ও সিস্টেমের প্রতীক, বাঙালি বিক্রয়কর্মী সেখানে মধ্যবিত্তের ক্ষয়িষ্ণু নৈতিকতা ও করুণ জীবনসংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতিনিধি।
সময়ের বিবর্তনে রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালার বাদাম-কিশমিশের ঝুলি কিংবা উইলি লোম্যানের ভারী সুটকেস আজ রূপান্তর ঘটেছে ল্যাপটপ, স্মার্টফোন আর অদৃশ্য কর্পোরেট টার্গেটে। আজকের বাজারে বিক্রয়কর্মীরা আর কেবল ‘সেলসম্যান’ নন; তারা এখন ‘বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার’ বা ‘অ্যাকাউন্ট এক্সিকিউটিভ’। ধুলোবালি মাখা রাস্তার বদলে তারা এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে বসেন ঠিকই, কিন্তু ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ট্র্যাকিং অ্যাপের নজরদারি এবং KPI (Key Performance Indicator)-এর জাঁতাকল তাদের জীবনকে এক আধুনিক যান্ত্রিক দাসত্বে পরিণত করেছে।
একবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি এই পেশাকে নিয়ে গেছে আরও একধাপ অচেনা অধ্যায়ে—যা ‘ডিজিটাল সেলসম্যানশিপ’। আজকের দিনে সবচেয়ে বড় বিক্রেতা কোনো মানুষ নয়, বরং ফেসবুক বা অ্যামাজনের অদৃশ্য অ্যালগরিদম (Algorithm) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), যা ক্রেতার অজান্তেই তার মনস্তত্ত্ব হ্যাক করে পণ্য হাজির করছে। সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার বা কনটেন্ট ক্রিয়েটররা আজ নতুন যুগের ফেরিওয়ালা, যারা লাইভ স্ট্রিমিংয়ের কথার জাদুতে লাখ লাখ পণ্য বিক্রি করছেন। তবে এই ডিজিটাল রূপান্তরের সাথে সাথে প্রতারণার ধরনও বদলে গেছে। ভুয়া রিভিউ কেনা, হিডেন কস্ট (অদৃশ্য চার্জ), ক্লিকবেইট কিংবা ‘ফোমো’ (FOMO - Fear of Missing Out) তৈরি করে ক্রেতাকে অপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে বাধ্য করা আজ ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় চাতুর্য।
কাল থেকে কালান্তরে বিক্রয়কর্মীর বহিরাঙ্গ বদলেছে, অ্যানালগ সুটকেস বদলে আজ ডিজিটাল স্ক্রিন হয়েছে, কিন্তু বদলায়নি তার ভেতরের আদিম মনস্তত্ত্ব ও নিয়তি। গতকাল যে বিক্রেতা হাটের ধুলোয় দাঁড়িয়ে কথার জাদুতে মানুষকে সম্মোহিত করতেন, আজ কর্পোরেট কেপিআই-এর চাপে কিংবা অ্যালগরিদমের আড়ালে বসে তিনিই ক্রেতার অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। বিক্রয় কৌশল হয়তো সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়েছে, কিন্তু পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নির্মম জাঁতাকলে পড়ে একজন বিক্রয়কর্মীর টিকে থাকার লড়াই, তার একাকীত্ব এবং নৈতিকতার অবক্ষয়ের মূল গল্পটি আজও অবিকল একই রয়ে গেছে।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
01884-553490
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.