জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর:
ঈদ মানেই আনন্দ, উৎসব আর প্রিয়জনদের সঙ্গে সুখ ভাগাভাগির মুহূর্ত। কিন্তু সমাজের অনেক মানুষ আছেন, যাদের কাছে ঈদ আসে নিঃশব্দে—অভাব, কষ্ট আর অনিশ্চয়তার মাঝেই। ঠিক এমন মানুষগুলোর মুখে ঈদের হাসি ফোটাতে এগিয়ে এসেছেন যশোরের মনিরামপুর উপজেলার নারী উদ্যোক্তা, শিক্ষানবিশ আইনজীবী সানজিদা জেরিন। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তিনি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী ও নতুন পোশাক বিতরণ করে মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
ঈদের আগে কয়েকদিন ধরে তিনি উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে ঘুরে দরিদ্র পরিবারের দরজায় কড়া নেড়েছেন। কারও হাতে তুলে দিয়েছেন সেমাই, চিনি, চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী; আবার কারও হাতে দিয়েছেন শাড়ি, লুঙ্গি ও শিশুদের জন্য নতুন পোশাক। অনেক পরিবারে তিনি নিজে উপস্থিত হয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন তাদের জীবনসংগ্রামের গল্প।
মনিরামপুর উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের বিধবা নারী রহিমা বেগম চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, “স্বামী মারা গেছে পাঁচ বছর আগে। দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটে। ঈদ আসলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট লাগে—বাচ্চারা নতুন কাপড় চায়, কিন্তু আমার সামর্থ্য হয় না। আজ আপা (সানজিদা জেরিন) এসে যখন শাড়ি আর খাবার দিলেন, তখন মনে হলো কেউ যেন আমাদের দুঃখটা বুঝেছে। আল্লাহ তাকে ভালো রাখুক।”
আরেক উপকারভোগী দিনমজুর আব্দুল করিম বলেন, “কাজ না থাকলে ঘরে চুলা জ্বলে না। কয়েকদিন ধরে কোনো কাজ পাচ্ছিলাম না। ভাবছিলাম ঈদটা কেমন করে কাটবে। আজ চাল-ডাল আর সেমাই পেয়ে মনে হচ্ছে এবার অন্তত বাচ্চাদের মুখে হাসি ফুটবে।”
একটি ছোট্ট শিশু, যার হাতে নতুন পোশাক তুলে দেন সানজিদা জেরিন, আনন্দে বলছিল, “আমি ভাবছিলাম এবার ঈদে নতুন জামা পাবো না। আপা আমাকে নতুন জামা দিয়েছে, আমি ঈদের দিন এটা পরেই নামাজে যাব।”
এই দৃশ্যগুলো যেন কেবল সাহায্য বিতরণের নয়—বরং মানুষের কষ্ট, আশা আর মানবিকতার এক গভীর গল্প হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়রা জানান, অনেক সময় দেখা যায় সহায়তার নামে তালিকা তৈরি হলেও প্রকৃত অসহায় মানুষগুলো বাদ পড়ে যায়। কিন্তু সানজিদা জেরিন সরাসরি মানুষের বাড়িতে গিয়ে তাদের অবস্থা দেখেই সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষগুলোই বেশি উপকৃত হয়।
এ বিষয়ে সানজিদা জেরিন বলেন,
“ঈদ আনন্দের উৎসব হলেও সমাজের অনেক মানুষ সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত থাকে। আমি চেষ্টা করি অন্তত কিছু মানুষের পাশে দাঁড়াতে, যাতে তাদের ঈদটা একটু হলেও আনন্দময় হয়। মানুষের মুখে হাসি দেখলেই আমার সব কষ্ট সার্থক মনে হয়।”
তিনি আরও বলেন, “মানুষ মানুষের জন্য—এই বিশ্বাস থেকেই আমি কাজ করার চেষ্টা করি। আমাদের সমাজে অনেক সামর্থ্যবান মানুষ আছেন। সবাই যদি নিজের অবস্থান থেকে সামান্য সহযোগিতা করেন, তাহলে অসহায় মানুষের কষ্ট অনেকটাই কমে যাবে।”
স্থানীয় সমাজসেবক ও বাসিন্দারা জানান, একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে সানজিদা জেরিন যেভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তাদের মতে, বর্তমান সময়ে এমন মানবিক উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দেয়।
তারা বলেন, “মানুষের দুঃখ-কষ্ট বোঝা এবং নীরবে তাদের পাশে দাঁড়ানো খুব বড় একটি কাজ। সানজিদা জেরিন সেটিই করে দেখাচ্ছেন। তিনি শুধু সহায়তা দিচ্ছেন না, মানুষের মনে সাহসও জাগিয়ে তুলছেন।”
উল্লেখ্য, মানবিক কর্মকাণ্ডে সানজিদা জেরিনের এই উদ্যোগ নতুন নয়। এর আগেও করোনা মহামারির কঠিন সময়ে তিনি নিজের মাটির ব্যাংকে জমানো টাকা ভেঙে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই অর্থ দিয়ে তিনি বহু দরিদ্র পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বন্যা দুর্গত মানুষের জন্য বিপুল পরিমাণ ত্রাণ বিতরণ করে তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন।
মানবিক কাজের প্রতি তার এই অঙ্গীকার ও নিষ্ঠার কারণে অনেকেই তাকে ভালোবেসে “মানবতার ফেরিওয়ালা” নামে অভিহিত করেছেন। তার এই উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে প্রশংসিত হয়েছে এবং অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
মনিরামপুরের বিভিন্ন ইউনিয়নে ঈদ সামগ্রী বিতরণের এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি দান বা সহায়তা নয়—বরং এটি মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। স্থানীয়দের মতে, এমন মানবিক উদ্যোগ যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সমাজে অসহায় মানুষের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হবে এবং ঈদের প্রকৃত আনন্দ পৌঁছে যাবে সবার ঘরে।
প্রধান উপদেষ্টা : ফরহাদ মাজহার
প্রকাশক ও সম্পাদক : মোঃ আবুল হাসেম
সহকারী সম্পাদক : মোঃ ছাব্বির হোসেন
সহ সম্পাদক : মোঃ গোলাম কিবরিয়া
নির্বাহী সম্পাদক : মেছবাহ উদ্দিন (01884-553490, 01911-206989)
Copyright © 2026 Dainik Banglar Sangbad. All rights reserved.